হনুমান এক অসামান্য বীর, তাঁহাকে বিপদে ফেলিতে পারে এমন দেব-দানব-রক্ষ-যক্ষ কেহই জন্মায় নাই। কিন্তু ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ববাদী নেতারা এমন একটি প্যাঁচ মারিয়াছেন, ভদ্রলোকের কিঞ্চিৎ শ্বাসরোধ হইতে পারে। বানর-দেবতাটি অবশ্য জটিল বিতর্কে ভয় পাইবার পাত্র নহেন, তিনি জন্মমাত্র মাতা অঞ্জনা কর্তৃক অরণ্যে পরিত্যক্ত হন, কারণ তাঁহার জন্ম পবনদেবের ঔরসে, যিনি অঞ্জনার স্বামী নহেন। তখন হনুমান ক্ষুধার তাড়নায়, সূর্যকে ফলভ্রমে ভক্ষণ করিতে লম্ফ প্রদান করেন। ওই সময়েই রাহুও সূর্যকে গ্রাস করিতে আসিয়াছিলেন, তিনি দৌড়াইয়া ইন্দ্রের নিকট নালিশ করিলেন। ইন্দ্র বজ্রদ্বারা হনুমানকে প্রহার করেন। পবন ভূপাতিত সন্তানকে লইয়া অভিমানবশে গুহায় লুকাইলে, জীবজগৎ হাঁপানি-আক্রান্ত হইল। দেবতারা তখন তড়িঘড়ি আসিয়া হনুমানকে একের পর এক বরদান করিলেন। ফলে মহাবীরের অলৌকিক গুণগুলি কিছু ভ্রম ও কিছু সমাজনিন্দিত কার্যের যোগে অর্জিত। আবার শিশু হনুমান দেবতাদিগের বরে বলীয়ান হইয়া সকলকে এমন অত্যাচার করিতে লাগিলেন, ঋষিগণ শাপ দেন: তাঁহার বল বর্ধিত হইবে একমাত্র যখন কেহ তাঁহার কীর্তি স্মরণ করাইয়া দিবে। তাই বালী কর্তৃক তাঁহার সুহৃদ সুগ্রীব সাতিশয় উৎপীড়িত হইলেও, হনুমান তাহার প্রতিবিধান করিতে পারেন নাই। অতএব যদি কেহ হনুমানের শরণ লহে ভোটের বৈতরণি পার হইতে, কিন্তু হনুমানের প্রকৃত কীর্তি ও তাহার তাৎপর্যগুলি স্মরণ করিতে ও করাইয়া দিতে না পারে, তখন হনুমান তাহাকে পূর্ণ সামর্থ্যে রক্ষা করিতে পারিবেনই না। অবান্তর ও অপ্রয়োজনীয় সমস্যা হনুমানের জীবনে বহু আসিয়াছে, সীতার সন্ধানার্থে যখন তিনি সমুদ্র লঙ্ঘন করিতে লম্ফ দিলেন, দেবতা ও গন্ধর্বেরা নাগমাতা সুরসাকে নিয়োগ করিলেন, হনুমানের গতিরোধের জন্য। হনুমান কোনও বিরক্তি না প্রকাশ করিয়া, নিজ দেহ বর্ধিত করিয়া, পুনরায় সঙ্কুচিত করিয়া, সুরসার বদনমধ্যে প্রবেশ করিয়াই বহির্গত হইলেন। প্রমাণ করিলেন, তিনি কার্যসিদ্ধি নিমিত্ত বড় বা ছোট যাহা ইচ্ছা হইতে পারেন। তিনি নমনীয় ও বুদ্ধিমান। উচ্চ জাত ও নীচ জাতের তর্কে তিনি যাইবেনই না, বলিবেন, যাহা বনিলে গন্তব্য হাসিল হয়, আমি সেই জাত। নাটকীয়তা অবশ্য তিনি প্রবল পছন্দ করেন, সীতাকে অনায়াসে পৃষ্ঠে চড়াইয়া লইয়া আসিবার প্রকল্প তিনি ত্যাগ করেন, কারণ তাহা হইলে রামের অসামান্য ও ঘটনাবহুল কীর্তির অবকাশই থাকিবে না, কাব্যটি হুট করিয়া তিন ফর্মায় সমাপ্ত হইয়া যাইবে। তাই তাঁহার জাতিবিচার লইয়া নাট্য জমিলে, তিনি পাত্রদের লাঙ্গুলে জড়াইয়া সহাস্যে লোফালুফি খেলিতে পারেন। 

হনুমানকে অকস্মাৎ দলিত বলা হইল কেন, সহজবোধ্য। ভারতীয় জনতা পার্টি দলিতদের ক্রোড়ে টানিবার চেষ্টা করিতেছে, তাই একটি দেবতাকে দলিত বলিয়া খাড়া করিলে, প্রমাণ হইবে, বহু দিন হইতেই দলিতসমীহ বিজেপির দর্শনের অন্তর্গত। কিন্তু  অধিকাংশ ব্রাহ্মণ সমাজজীবনে দলিতদের অবজ্ঞা ও ঘৃণা করেন। সহসা পূজ্য দেবতাকে দলিত বলিয়া ভাবিবার অনুশাসন উদিত হইলে, মানিবেন কেন? ফলে গৃহযুদ্ধ উপস্থিত, কেহ বলিতেছেন হনুমান পরম ব্রাহ্মণ, কেহ বলিতেছেন চরম ক্ষত্রিয়, কেহ তাঁহার উপবীতের দিকে আড়ে চাহিতেছেন, কেহ লাঙ্গুলের দিকে। কিন্তু পর্বতে ঔষধের সন্ধানকালে ওষধিগণ তাঁহাকে দেখিয়া অদৃশ্য হইলে যে-মহাবল ক্রোধবশে সমগ্র পর্বত উৎপাটন করিয়া লাইয়া আসেন, তিনি আবার দেবতার জাতিনির্ণয়ের উদ্ভটতার প্রদর্শনী দেখিয়া গোটা দলটির উপর না খেপিয়া যান। তাঁহার লাঙ্গুল স্বয়ং ভীমও নড়াইতে পারেন নাই, তাঁহার জেদকে কে নড়াইবে? অবশ্য কেবল ক্রোধ নহে, দেবতাটির মধ্যে অশেষ ভক্তিও বহমান। তিনিই একমাত্র প্রাণী, যিনি এক্স-রে’র প্রয়োজন নস্যাৎ করিয়া নিজ বক্ষমধ্যে কী অাছে তাহা উন্মুক্ত করিয়া দেখাইতে পারেন ও উচ্চ নীতির প্রতি আনুগত্যের অতুলনীয় উদাহরণ স্থাপন করেন। তিনি যদি সকল জাতের সম্মিলনকে নিজমধ্যে প্রতিভাত করিতে পারেন, বা অত্যাধুনিক প্রবণতা আত্মীকৃত করিয়া বলিতে পারেন, নহি ব্রাহ্মণ, নহি দলিত, নহি আমি কিচ্ছু, হয়তো অন্য ভারত উদিত হইবে। মনে রাখিতে হইবে, তিনি তো বুঝাইয়াছেন, বহু ইঞ্চি ব্যাপী বক্ষছাতি থাকিলেও তাহার মধ্যে কেবল রৌদ্ররস নহে, অশেষ প্রেম ও ভক্তি অধিষ্ঠান করিতে পারে। কে বলিতে পারে, সেই অনুপ্রেরণা অন্য কাহারও মধ্যে কাজ করিলে, এই দেশের কেমন অবস্থা হইবে!

যৎকিঞ্চিৎ

অ্যাপ্‌ল নাকি এ বার আনছে ‘আই-শিট’, অর্থাৎ এমন এক ই-চাদর, যাতে পিলপিল করবে সূক্ষ্ম সেন্সর ও ক্যামেরা, যা মাপবে ঘুমন্ত ব্যক্তির  শ্বাস, হৃৎস্পন্দন, তাপমাত্রা, ঘুমের মান। কে বলতে পারে, হয়তো ঘুমোতে ঘুমোতে হার্ট অ্যাটাকের উপক্রম হলে ডাক্তারকে আপনিই কল করে দেবে অাই-ফোন, বা বেশি নাক ডাকলে শব্দদূষণ দফতরে নালিশ জমা দেবে! এমনিতেই আই-ঘড়ি এখন বলে দিচ্ছে ‘তেলেভাজা খাবেন না’, বা ‘এ বার হাঁটুন’। আই-কমোড এসে গেলে আর দেখতে হবে না!