পড়ুয়াদের এই অবস্থায় জন্য অনেকটাই দায়ী প্রাথমিকের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের লেখাপড়া শেখানোর প্রথম দায়িত্ব কিন্তু তাঁদেরই। তাঁরা চার বছরে যদি শুধুমাত্র বাংলা সাবলীল ভাবে পড়তে শেখাতেন এবং ইংরেজি ছোট হাতের অক্ষর লেখাতে শেখাতেন তা হলেই কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার চেহারাটা বদলে যেত। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাথমিকের শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন না। 

তাঁরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, পড়ুয়ারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। পোশাক, স্কলারশিপ, ব্যাগ, বই নেওয়ার জন্য তারা বিদ্যালয়ে আসে। আর আসে পরীক্ষার সময়। স্কুলে পড়ুয়া না এলে তাঁদের কিছু করার নেই। এই প্রসঙ্গে বলি, একটি বা দু’টি গ্রাম নিয়ে এক-একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। প্রত্যেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পার্শ্বশিক্ষক আছেন। যে পড়ুয়ারা বিদ্যালয়ে আসছে না তাদের পরিবারের সঙ্গে টিফিনের পরে সপ্তাহে এক দিন বা দু’দিন যোগাযোগ করা যেতেই পারে। পার্শ্বশিক্ষক ছাড়াও পূর্ণ সময়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও এই কাজটি করতে পারেন। এই কাজটি করার জন্যই পার্শ্ব-শিক্ষকদের একটি দিন এখনও নির্দিষ্ট আছে। তার পরে পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের চিহ্নিত করে যদি ইংরেজি বর্ণমালা আর মাতৃভাষাটাই শুধুমাত্র পড়তে শেখানো হত, তা হলেই ওদের পৃথিবীটা হয়তো বদলে যেত। 

মুর্শিদাবাদে বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এই কাজগুলো সাফল্যের সঙ্গে করছে। তাই এখনও ওই বিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের সংখ্যা কমার বদলে বাড়ছে। অন্য স্কুলে কিন্তু উল্লেখজনক ভাবে পড়ুয়া কমছে। গ্রামে গ্রামে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে নার্সারি স্কুল। প্রাথমিক স্কুল থেকে বহু পড়ুয়া সেখানেই ছুটছে। চার বছর বয়সেও যদি অক্ষরজ্ঞান না হয় প্রাথমিকের শিক্ষক-শিক্ষিকা তার দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। এখন শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব অনেকটা মিটেছে। তা সত্ত্বেও প্রাথমিকের পড়ুয়ারা কেন মাতৃভাষা লিখতে বা পড়তে জানবে না? প্রাথমিকের পাঠ কেন উচ্চ বিদ্যালয়ে দিতে হবে? প্রাথমিকের শিক্ষক-শিক্ষিকারা কেন পড়ুয়াদের অক্ষর-পরিচয় না করিয়েই উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঠাবেন? নিজের ছেলেমেয়েকে যে ভাবে শিক্ষিত করার চেষ্টা করেন সে ভাবে কেন পড়ুয়াদের শিক্ষিত করার চেষ্টা হবে না? কোনও পড়ুয়া চার বছর ধরে প্রাথমিকে পড়ার পরেও যদি নিজের নাম লিখতে না পারে, যদি বাংলা সাবলীল ভাবে পড়তে না পারে তার দায় কিংবা ব্যর্থতা কার? 

মার্কশিটে পড়ুয়ারা ফেল না করলেও অক্ষরজ্ঞানের প্রশ্নে ফেল করে যায়। আসলে পড়ুয়ারা নয়, ফেল করে যান স্কুলের শিক্ষক–শিক্ষিকারা। শিক্ষার ভিত হল প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখান থেকে ভিত শক্ত হলেই পড়ুয়ার উন্নতি হবে। ভিত নড়বড়ে হলে উঁচু ক্লাসেও পড়াশোনা নড়বড়ে হবে। তাই প্রাথমিকের ভিত শক্ত করতে এগিয়ে আসা উচিত শিক্ষকদের। চার বছর ধরে পড়ানোর পরেও পড়ুয়াদের এই দশা দেখার জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা শিক্ষার পিছনে খরচ করে না। সে কথা মাথায় রেখে পড়ুয়াদের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়া উচিত শিক্ষকদের। 

এ বার আসি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রসঙ্গে। প্রাথমিক স্কুল থেকে পড়ুয়াদের একটি বড় অংশ অক্ষরজ্ঞান না নিয়েই গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলিতে ভর্তি হয়। উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও আমরা ওদের এই অবস্থা নিয়ে ভাবি না। ভাবি, কিচ্ছু করার নেই। আমাদের কাজ পাঠক্রমের বই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা। পরীক্ষা নেওয়া, খাতা দেখা, বার্ষিক পরীক্ষার ফল তৈরি করা। এবং শূন্য পেলেও ফর্মেটিভের নম্বর বাড়িয়ে পঞ্চাশ শতাংশ করে দেওয়া। ওরা একই শ্রেণির বিভিন্ন বিভাগে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভর্তি হয়। শিক্ষা বিজ্ঞান অনুযায়ী, এগিয়ে থাকা ও পিছিয়ে থাকা পড়ুয়াদের একই সঙ্গে রেখে পড়াশোনা করানো ভাল। কিন্তু শিক্ষা-বিজ্ঞানীরা মাতৃভাষা পড়তে না জানা পড়ুয়াকে পিছিয়ে পড়া বলেননি। তাঁরা ভাবেননি, পঞ্চম, ষষ্ঠ বা অষ্টম শ্রেণিতেও মাতৃভাষা পড়তে না পারা পড়ুয়া থাকতে পারে! 

প্রশ্ন হল, মাতৃভাষা পড়তে না পারা পড়ুয়ারা আদৌ কি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের সময় যোগ দেওয়ার যোগ্য? নাকি তার পক্ষে যোগদান করা সম্ভব? বাংলা পড়তে না জানা পড়ুয়া কী ভাবে ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান পড়বে? কী ভাবেই বা অঙ্ক কষবে? ওরা পড়ে না কারণ পড়তে পারে না। তারা শ্রেণিকক্ষে শুধু বসে থাকে। ভয়ে ভয়ে থাকে, এই বুঝি স্যর পড়া ধরল! অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা পিছিয়ে থাকা পড়ুয়াদের পড়া ধরেন না। শ্রেণিকক্ষের এগিয়ে থাকা প্রথম সারির গুটিকয়েক পড়ুয়াকে পড়া ধরেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের দিকে মনযোগ দিয়ে ক্লাস শেষ করেন। বাকিরা থাকে উপেক্ষিত। কারণ, শিক্ষক-শিক্ষিকারা মনে করেন, ওদের দিকে মনযোগ দিয়ে লাভ নেই। এই লাগাতার ভয় এবং উপেক্ষার কারণে বিদ্যালয়ের প্রতি তারা নিরুৎসাহী হয়ে ওঠে। যতই বিদ্যালয়ের পরিবেশ ভাল হোক না কেন, ওরা বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষণ হারায়। বাড়তে থাকে স্কুলছুটের সংখ্যাও। 

এখন দেখা যাচ্ছে, অষ্টম শ্রেণির পরে বিদ্যালয়ে ছেলেদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। আর পড়তে না পারা মেয়েরা নবম থেকে দশম শ্রেণিতে ওঠার পরীক্ষায় পাশ করতে পারে না। ফলে তারা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে পারে না। আবার কোনও ভাবে মাধ্যমিক দেওয়ার সুযোগ পেলেও ফেল করে যায়। বয়স আঠেরো হওয়ার আগেই মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয় বলে তারা কন্যাশ্রীর টাকা থেকেও বঞ্চিত হয়। বিয়েটাও হয়েও যায়। ফলে বাল্যবিবাহ যেমন হয়, তেমনি কন্যাশ্রীর টাকা থেকেও বঞ্চিত হয়। আগামী দিনের মায়ের কাছ থেকে শিশুও কিছু শিখতে পারে না। মায়ের শিক্ষা আগে না হলে শিশু কী ভাবে মায়ের কোলে শিখবে? 

প্রধান শিক্ষক, লস্করপুর উচ্চ বিদ্যালয়