এটা গত শতকের একেবারে গোড়ার কথা (১৯০৬)। প্রতিবেশী যুবকের হাত ধরে কলকাতার সরকারি শিল্পবিদ্যালয়ে হাজির বছর বাইশের এক যুবক। মনে প্রবল ইচ্ছা ভর্তি হওয়ার। যদিও এর আগে শহর কলকাতার তিন-তিনটে কলেজ তার ঘোরা হয়ে গিয়েছে। কোথাও সুবিধা করতে পারেননি। জেনারেল এসেমব্লিজ ইন্সটিটিউশনে প্রথমে অকৃতকার্য হয়ে মেট্রোপলিটনের গুড়ি ছুঁয়ে শেষে প্রেসিডেন্সিতে। সেখানেও গতানুগতিক বাণিজ্যিক বিষয়ের পঠন পাঠনে যে সফল হবেন না, তা বুঝে উঠতে তাঁর বেশী সময় লাগেনি। অবশেষে সরকারি আর্ট স্কুল। কেননা ইতিমধ্যে সেখানকার এনগ্রেভিংয়ের ছাত্র সত্যেন বটব্যালের মুখে এ কলেজ সম্পর্কে তার অনেক গল্প শোনা হয়ে গিয়েছে। 

সম্পর্কে  আত্মীয় এক দাদাও সেখানকার ছাত্র। তা ছাড়া প্রেসিডেন্সিতে থাকার সময় ছবি আঁকার কাজে খানিকটা হাতও পাকিয়েছে। চিত্রকলায় তার গভীর আগ্রহ। আর্ট স্কুলে তখন সবে শুরু হয়েছে দেশীয় শিল্পচর্চার কর্মযজ্ঞ। যার পুরোভাগে ঋত্বিকের ভূমিকা নিয়েছেন ঠাকুরবাড়ির প্রখ্যাত শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর শিল্পকর্মের সোনালী ফসল প্রবাসী পত্রিকা মারফত দেশের ঘরে ঘরে ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছে।  সে সব দেখে ভালোলাগার এক আবেশ জমাট বেঁধেছে আমদের এ যুবকের মনে। অবনীন্দ্রনাথের ‘বুদ্ধ ও সুজাতা’ ‘বজ্রমুকুট’ দেখে মুগ্ধ সে। প্রতিবেশী  সত্যেন বটব্যাল ছেলেটিকে এক দিন অবনীন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, স্যার একে আপনার নিতে হবে। তিনি তখন সেখানকার ভাইস-প্রিন্সিপাল। মুখ তুলে তাকালেন অবনীন্দ্রনাথ। দেখলেন শ্যামবর্ণ একটি ছেলে দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘স্কুল পালিয়ে আসা হয়েছে বুঝি? পড়াশুনায় মন নেই, তাই মশকো করতে এসেছো। লেখা পড়া শিখেছ কিছু?’ উত্তর এল –‘আজ্ঞে স্কুল নয় ,কলেজ। তবে ফেল করেছি’। মানতে চাইলেন না মাস্টারমশাই। ‘‘উঁহু বিশ্বাস হচ্ছে না। সার্টিফিকেট দেখতে চাই।’ পরে বললেন, ‘দেখি তোমার হাতের কাজ।’ ছেলেটি একটি ছবি বার করলো, লতাপাতা গাছগাছালির মাঝে একটি মেয়ে, পাশে হরিণ, শকুন্তলার ছবি। অবনীন্দ্রনাথের মন ভরল না তাতে। বললেন, ‘এতে হবে না। কাল একখানা গনেশের ছবি এঁকে নিয়ে এসো দেখি।’ পর দিন আবার  হাজির সে। সঙ্গে শ্বশুর মশাই। গোটানো একখানা কাগজ বের করে মেলে ধরলো অবনীন্দ্রনাথের সামনে— একটা কাঠিতে ন্যাকড়া জড়ানো আর সেই ন্যাকড়ার ওপর সিদ্ধিদাতা গনেশের অবয়ব। চমৎকার ছবি অবনীন্দ্রনাথ অস্ফুটে বলে উঠলেন, শাবাশ। শ্বশুরমশাই  পাশ থেকে বললেন— ‘ছেলেটাকে আপনার হাতে দিলাম’। অবনীন্দ্রনাথ বললেন, ‘লেখাপড়া শেখালে বেশী রোজগার করতে পারবে কিন্তু।’ এতক্ষণ চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকা সে ছেলের মুখ থেকে এ বার কথা সরল, ‘লেখাপড়া শিখলে তো ত্রিশ টাকার বেশী রোজগার হবে না। এতে আমি তার বেশী রোজগার করতে পারবো।’ ভাইস-প্রিন্সিপাল আর না করতে পারলেন না। সেই থেকে ছেলেটি নাড়া বাঁধল অবনীন্দ্রনাথের কাছে। পরবর্তীকালে এই ছেলেই হয়ে উঠেছিলেন ভারত শিল্পের অন্যতম পথিকৃত নন্দলাল বসু।

কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ হ্যাভেল সাহেব বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে অবনীন্দ্রনাথকে ভাইস প্রিন্সিপালের পদে বসিয়েছিলেন। দুপুরে ঘুমের ব্যাঘাত হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মনিষ্ঠার  অসহ্য বেড়াজালের ওজর তুলে অবনীন্দ্রনাথ সাহেবের মাস্টারির প্রস্তাবকে পাশ কাটাতে চেয়েছিলেন। হ্যাভেল কিন্তু তাঁকে ছাড়েননি। কলেজেই দুপুরের বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেবেন বলেছিলেন। শেষে সাহেবের জেদের কাছে হার মেনে ভাইস-প্রিন্সিপাল হলেন অবনীন্দ্রনাথ। শুরুতে সুরেন গাঙ্গুলি ও আরও দু-চার জনকে নিয়ে তার মাস্টারি জীবনের পথ চলা শুরু। এমন সময় হঠাৎ এক দিন নন্দলালের আবির্ভাব। এরপর এক পাশে নন্দলাল আর অন্য পাশে সুরেন গাঙ্গুলিকে রেখে অবনীন্দ্রনাথ ভারত-শিল্পের পথ পরিক্রমা করলেন সারথী হয়ে। তার শিক্ষাগুণে আর নন্দলালের হাতের যাদুতে এ সময়ে রূপ পেল ‘কর্ণের সূর্যস্তব’, ‘কৈকেয়ী-মন্থরা’, ‘সতী’, ‘শিব ও সতী’, ‘উমার তপস্যা’র মতো বিখ্যাত সব ছবি।

সে বার জনৈক আইরিশ দুহিতা এসেছেন আর্ট স্কুলে। অবনীন্দ্রনাথ তাকে ছাত্রদের শিল্প-কর্ম দেখাচ্ছেন। তিনটে ছবিতে অতিথির চোখ আটকে গেল। প্রথমটি কৃষ্ণ-সত্যভামা’র তো পরের দু’টি কালী আর দশরথ-কৌশল্যা’র।

‘কৃষ্ণ-সত্যভামা’র ছবিতে সত্যভামার পা ধরে বাসব তার মানভঞ্জনে রত। অবাক হলেন অতিথি   নারীর পা ধরে পুরুষের মানভঞ্জন! দৃষ্টিকটু বটে, খারাপ দেখায়। শিল্পীকে এ জাতীয় ছবি আর আঁকতে নিষেধ করলেন।  মা কালীর ছবি তাঁকে তৃপ্তি দিয়েছিল যদিও, তবু দীর্ঘ বস্ত্র পরিহিতা সে কালীমূর্তি যেন স্বাভাবিকতার গণ্ডি খানিকটা অতিক্রম করে গিয়েছিল। মা-কালী যে দিগ্‌বসনা, প্রলয়ঙ্করী। শিল্পীকে তিনি কালী সম্পর্কে স্বামীজীর লেখা কবিতাখানি (‘Kali the Mother’) একটিবার পড়তে বললেন।

তৃতীয় ছবি ‘দশরথের মৃত্যু-শয্যা’য় রামচন্দ্রের বনাগমনের শোকে মৃত দশরথের দেহের পদমূলে উপবিষ্ট কৌশল্যার বিয়োগ ব্যথা মূর্ত। হাতে তার একখানা পাখা। ছবিতে ফুটে ওঠা শান্তির বাতাবরণ অতিথির মন ছুঁয়ে গেল। এ যেন মা সারদা’র গৃহের প্রশান্তি! তবে স্মিত হেসে তিনি বললেন, কৌশল্যা রাজরানি। তাঁর হাতে তালপাতার পাখা? রাজরানির হাতে হাতির দাঁতের পাখাই শোভা পায়। শিল্পীকে ডেকে বললেন, যাদুঘরে হাতির দাঁতের পাখা রাখা আছে, তিনি যেন একবারটি গিয়ে তা’ দেখে আসেন।

যাঁর চিত্রকলা সম্পর্কে জনৈক আইরিশ অতিথি এ মন্তব্য করেছিলেন, কলকাতার সরকারি শিল্প বিদ্যালয়ে নবাগত সে ছাত্রটি পরবর্তীকালে হয়ে উঠবেন বিশ্ববিশ্রুত নন্দলাল। আর দ্রষ্টা-সমালোচকের ভূমিকায় আইরিশ দুহিতা মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল, আমাদের ভগিনী নিবেদিতা। ব্রহ্মচারী গণেন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন তিনি। যাবার সময় বললেন, ‘গণেন একে তুমি আমার বাগবাজার বোসপাড়া লেনের বাড়িতে নিয়ে এসো।’ অসিতকুমার হালদারকে নিয়ে কিছুদিন পরেই নন্দলাল হাজির হয়েছিলেন তাঁর বাড়িতে। কিন্তু নিবেদিতার গৃহে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা নিদারুণ। বোসপাড়া লেনের ছোট্ট দোতলা বাড়ির আরও ছোট এক ঘর। মেঝেতে কার্পেট পাতা। তার ওপর সোফা। বসতে বলা হলে, নন্দলাল-রা সোফায় গিয়ে বসলেন। তা দেখে নিবেদিতা তাদের আসন করে বসতে বললেন। আসন করে বসা মানে তো মাটিতে বসা। নীরবে তারা সোফা থেকে নেমে মেঝেতে বসলেন। নন্দলালদের মনে অভিমানের ফুলকি জ্বলল। বোধ হয় বুঝতে পারলেন তিনি। স্বীকার করলেন, বুদ্ধের দেশের লোক হয়ে তাদের সোফায় বসতে দেখে তাঁর ভাল লাগে না। মাটিতে আসন করে বসাতে  তাদের যেন ঠিক বুদ্ধের মত লাগছে। দেখাচ্ছেও বেশ। কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে সে দিকে চেয়ে থেকে, কি দেখলেন কে জানে, খুশিতে উচ্ছ্বল হয়ে সঙ্গী ক্রিস্টিনাকে ডেকে তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

 

লেখক মহাদেবানন্দ মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক