E-Paper

শিক্ষার দাবি

নেতাই জুনিয়র হাই স্কুলকে ২০১৯ সালে হাই স্কুল করার পরেও অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। তিনশোর অধিক শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক রয়েছেন চার জন।

শেষ আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৯

পনেরো বছর ধরে শহিদদের নিয়ে অনুষ্ঠান হচ্ছে। অথচ, গ্রামের পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কারও কোনও পরিকল্পনা নেই— শ’খানেক স্কুলপড়ুয়ার মুখে এই কথাগুলি পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটির শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও এক বার বেআব্রু করে দেয়। বুঝিয়ে দেয়, কতখানি বিপন্ন বোধ করলে এক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ অ-রাজনৈতিক এক দাবি নিয়ে তারা হাজির হতে পারে। দাবিটি সামান্য নয়— শিক্ষার। দেশের সংবিধান যে অধিকারকে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার বলে বহু পূর্বেই চিহ্নিত করেছে। সম্প্রতি পনেরোতম নেতাই দিবসে লালগড়ে তৃণমূলের আয়োজনে স্মৃতি-তর্পণের অনুষ্ঠানে প্ল্যাকার্ড হাতে সভাস্থলে হাজির হয়ে শিক্ষার্থীরা, এবং তাদের সঙ্গে অভিভাবকরাও দাবি তুলেছেন— নেতাই হাই স্কুলে অবিলম্বে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক চাই। এমনও জানিয়েছেন— শিক্ষক নিয়োগ না হলে আগামী বছর নেতাই দিবসে নেতা-মন্ত্রীদের গ্রামে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গে সরকার কর্তৃক চূড়ান্ত অবহেলিত বিষয়গুলির মধ্যে শিক্ষাকে সর্বাগ্রে রাখা চলে। নেতাই জুনিয়র হাই স্কুলকে ২০১৯ সালে হাই স্কুল করার পরেও অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। তিনশোর অধিক শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক রয়েছেন চার জন। এই চিত্র সর্বত্র। সার্বিক ভাবে এক দিকে সরকারি প্রশ্রয়প্রাপ্ত সীমাহীন দুর্নীতি শিক্ষার মানকে তলানিতে পৌঁছে দিয়েছে, অন্য দিকে সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং প্রয়োগের অভাব, অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, পরিকাঠামো সংস্কারে নিদারুণ অনীহা এক বৃহৎ সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে। বহু সরকারি ও সরকারপোষিত বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক সংখ্যা উদ্বেগজনক ভাবে কম। শিক্ষকের অভাবে উঁচু শ্রেণিতে বিজ্ঞানের পাঠ বন্ধ রাখতে হয়েছে অনেক জায়গায়। যে ক’জন স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন, তাঁরাও বিবিধ সরকারি প্রকল্পে দীর্ঘ সময় নিযুক্ত থাকেন। শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনা তবে চলবে কী করে? শিক্ষকের অভাবে এক জন শিক্ষকই এক সঙ্গে একাধিক ক্লাস নিতে বাধ্য হচ্ছেন, শিক্ষাকর্মীর অভাবে স্বয়ং প্রধান শিক্ষককে ঘণ্টা বাজানো, তালা খোলার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। এগুলিকে ‘ব্যতিক্রম’ বলে উপেক্ষা করা অনুচিত, কারণ ‘ব্যতিক্রম’গুলিকে জড়ো করলে সেই সংখ্যাটি কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন যে কোনও প্রশাসনের উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, শিক্ষকের দাবি জানাতে শিক্ষার্থীরা একটি রাজনৈতিক মঞ্চ বেছে নিল কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর। এখানে প্রশাসন তার দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। বরং ক্ষমতাসীন দলের ছোট-বড় নেতারাই বকলমে প্রশাসনের মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ফলে, এই বিভ্রম স্বাভাবিক। অন্য দিকে, ২০১১ সালের জানুয়ারিতে লালগড়ের নেতাইয়ের গণহত্যা, এবং পশ্চিমবঙ্গের পট-পরিবর্তনের দেড় দশক অতিক্রান্ত। সেই গ্রামেই এখন শিক্ষক-নিয়োগের দাবিতে পথে নামতে হচ্ছে পড়ুয়াদের— শাসক দলের পক্ষেও বিষয়টি গৌরবের নয়। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা-সঙ্কট এখন ঘোর বাস্তব। শুধু কিছু বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ভবন নির্মাণেই তার হাল ফিরবে না। সর্বাগ্রে প্রয়োজন প্রশাসনিক সদিচ্ছা, এবং শিক্ষাকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা। যদিও শাসক দলের প্রতিক্রিয়াই বলে দেয়, সে সম্ভাবনা দূর অস্ত্।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

lalgarh Netai Dibas Netai

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy