E-Paper

পাকাপাকি অস্থায়ী

দশ মিনিটে ডেলিভারি, বা কার্যত নিখরচায় বাড়িতে বসে পণ্য পাওয়ার মতো যে বিলাসিতা উন্নত দুনিয়ায় অকল্পনীয়, ভারতে তা অতি স্বাভাবিক বাস্তব।

শেষ আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৫

বর্তমান দশকের প্রথম পাঁচ বছরে ‘গিগ ওয়ার্কার’ শব্দটি ভারতীয় অর্থব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করেছে— নির্দিষ্ট সংস্থার পোশাক পরে ব্যাগ পিঠে মোটরবাইক বা সাইকেলে ধাবমান কর্মিদলের সামগ্রিক পরিচিতি এই শব্দটি। এই পেশার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বটি তার নামেই নিহিত, বহুলব্যবহারে যা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। ইংরেজিতে ‘গিগ’ শব্দটির লোকজ ব্যবহার হয় কোনও সাময়িক, অস্থায়ী কাজকে বোঝাতে। অর্থাৎ, ধারণাগত ভাবেই পণ্য পরিবহণের এই পেশাটি অস্থায়ী, ফলে তার চরিত্রও তেমনই। কিন্তু, ভারতে কর্মসংস্থানের অবস্থা এমনই যে, বহু মানুষের কাছে এটিই নির্বিকল্প পেশা, হয়তো আজীবন জীবিকা। সংঘাতের সূত্রপাত এখানেই— সংস্থাগুলি বিলক্ষণ জানে যে, এই ক্ষেত্রে ‘ডেলিভারি পার্টনার’ হিসাবে কাজ করতে বাধ্য হওয়া শ্রমিকদের কাছে এ পেশা সাময়িক সংস্থান নয়; কিন্তু ব্যবস্থাগত ভাবে সে কথা স্বীকার করতে তারা নারাজ। গত বছরের শেষ দিন গিগ শ্রমিকরা যে কারণগুলিতে দেশব্যাপী ধর্মঘট ডেকেছিলেন, তাতে এই দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। তাঁদের ধর্মঘট সে ভাবে সফল হয়নি, বর্ষশেষে রেকর্ড পরিমাণ অনলাইন ডেলিভারি হয়েছে, সে কথা সত্য। ধর্মঘট যে আজকের দুনিয়ায় দাবিদাওয়া আদায়ের উৎকৃষ্টতম পন্থা নয়, সে কথাও সত্য। তেমনই এ কথাটিও সত্য যে, ভারতে গিগ কর্মীরা যে পরিস্থিতিতে কাজ করতে বাধ্য হন, প্রকৃত ধনতন্ত্র তাকে সমর্থন করে না। দশ মিনিটে জিনিস পৌঁছে দিতে জীবন-মরণ দৌড়ের বাধ্যবাধকতা, কোনও স্বচ্ছ নিয়ম না মেনেই হঠাৎ রেটিং কমিয়ে দেওয়া, মজুরি কাটছাঁট বা কাজ থেকে বহিষ্কার— যে পুঁজি শ্রমশক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থায়ী সম্পর্ক চায়, এগুলি তার পথ নয়। তবু ভারতের গিগ অর্থনীতি এ পথেই হাঁটছে, তার কারণ— গিগ অর্থ যে ভারতে বহু মানুষের কাছেই সাময়িক কাজ নয়, বিকল্পহীন বাধ্যবাধকতা, এ কথাটি তারা একই সঙ্গে অস্বীকার করে, এবং বোঝে।

দশ মিনিটে ডেলিভারি, বা কার্যত নিখরচায় বাড়িতে বসে পণ্য পাওয়ার মতো যে বিলাসিতা উন্নত দুনিয়ায় অকল্পনীয়, ভারতে তা অতি স্বাভাবিক বাস্তব। কারণ একটিই— প্রকৃত কর্মসংস্থানের অভাবে বাজারে অতি সস্তা শ্রমের জোগান। শ্রমের জোগান সস্তা হলে শিল্পক্ষেত্রে তার চাহিদা বাড়বে, শ্রমনিবিড় ব্যবসা তৈরি হবে বা তা ফুলেফেঁপে উঠবে, স্বাভাবিক। এখানে দু’টি ভিন্ন প্রশ্ন করা প্রয়োজন। ‘দশ মিনিটে ডেলিভারি’-র মতো ব্যবসায়িক উদ্যোগ সফল হয় তখনই, যখন ক্রেতাদের মধ্যে তার চাহিদা থাকে। এই চাহিদা নিতান্তই তৈরি করা, কারণ আজ থেকে এক দশক আগে কেউ ভাবতেই পারতেন না যে, অনলাইনে কিছু কেনার কার্যত সঙ্গে সঙ্গে সে পণ্য বাড়িতে পৌঁছে যাবে। এতে ক্রেতার সুবিধাও হচ্ছে নিশ্চিত। তবে, নৈতিক ভোগবাদ বস্তুটি যদি নিতান্ত সোনার পাথরবাটি না হয়, তবে এই ধরনের পরিষেবা ক্রয় করার আগে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ানো ক্রেতার কর্তব্য নয় কি? এ কথা কি ভাবা উচিত নয় যে, এই চাহিদা বহু মানুষকে আরও বেশি শোষণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? অতি সামান্য মূল্যে যথেচ্ছ পরিষেবা কিনতে পারার ‘স্বাধীনতা’য় ক্রেতারা এই ‘ডেলিভারি পার্টনার’দের ক্রমশ যন্ত্র হিসাবে দেখতে অভ্যস্ত হচ্ছেন?

কেউ পাল্টা যুক্তি দিতে পারেন যে, এই চাহিদা আছে বলেই কর্মসংস্থান হচ্ছে। কথাটি একই সঙ্গে ঠিক এবং ভুল। ক্রেতা যদি নৈতিকতাকে নিজেদের চাহিদার অন্তর্ভুক্ত করেন, শিল্পক্ষেত্রও তাকে মর্যাদা দিতে বাধ্য। অনৈতিক উৎপাদনের বিরুদ্ধে দুনিয়া জুড়ে ক্রেতাদের আপত্তি বহু উৎপাদককে পথ পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। তবে, ক্রেতার চেয়েও বেশি দায়িত্ব সরকারের। নতুন শ্রম বিধিতে গিগ অর্থনীতির স্বীকৃতি আছে, শ্রমিকদের জন্য ‘পোর্টেবল’ সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু, তা কোনও মতেই যথেষ্ট নয়। শ্রমিকের কাজের শর্ত ‘মানবিক’ করা ধনতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত। তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gig Workers Delivery Boy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy