অমিত শাহ নিশ্চয় রবীন্দ্রনাথকে দেশছাড়া করে ছাড়তেন। সম্প্রতি কর্নাটকের ম্যাঙ্গালোরে তিনি বচনামৃত শুনিয়েছেন— জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাদের আলাদা ও একঘরে করে দিন। উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের আগে বিজেপির ঝোলা থেকে জাতীয়তাবাদ ফের দাঁত, নখ খিঁচোচ্ছে কেন, সেটাও পরিষ্কার হয়ে গেল অচিরে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং জানালেন, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের কথা বলেই বিজেপি লোকসভা ভোটে জিতেছিল। ক্ষমতা ধরে রাখতে গেলে ওই আদর্শ থেকে চ্যুত হলে চলবে না।
যাক, ভুল বোঝার পালা সাঙ্গ হল। জানতাম, বিজেপি ভোটে জিতেছিল বিকাশপুরুষের কল্যাণে। যিনি একশো দিনের মধ্যে কালো টাকা ফিরিয়ে আনবেন, দুর্নীতি ঘোচাবেন, আপামর ভারতবাসীর কাছে নিয়ে আসবেন ‘আচ্ছে দিন’। এখন সব রাংতা ধুয়েমুছে সাফ।
এই জাতীয়তাবাদকে বহু আগেই নাকচ করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৮ সালে এক বন্ধুকে লিখেছিলেন তিনি: ‘হিরের দামে ঠুনকো কাচ কিনতে আমি নারাজ। জীবদ্দশায় মানবতার ওপর দেশপ্রেমকে তাই ঠাঁই দিতে চাই না।’ ভারতের ট্রাজেডি, নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহেরা একুশ শতকে এসেও সেই কাচ আর হিরের তফাত করতে পারলেন না।
বিজেপি রবীন্দ্রনাথকে মাথায় রেখে কথা বলবে, এই দুরাশা অবশ্য পাগলেও করে না। একটু-আধটু ইতিহাস জানতে হবে, এমন কোনও দাবিও নিশ্চয় তাঁদের কাছে করা যায় না। না হলে তাঁরা খেয়াল রাখতেন, এই বছরটাই রবীন্দ্রনাথের জাপান সফরের একশো বছর। এই কলকাতা থেকেই ১৯১৬ সালের ৩ মে তোসা মারু নামে এক জাহাজে চেপে জাপানে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তার তিন বছর আগে নোবেল পেয়েছেন তিনি। এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ীকে দেখতে কোবে বন্দরে প্রায় কুড়ি হাজার মানুষের ভিড়। ভারতীয় কবি জাপানিদের ছবি আঁকা, ফুল সাজানো, চা পানের শিল্পকলা দেখে অভিভূত।
কিন্তু আর একটা জাপান প্রথম থেকেই তাঁর ভাল লাগেনি। যে জাপান তুমুল জাতীয়তাবাদী, যে জাপান চিন এবং কোরিয়াকে পদানত করে রাখে। ‘এই রাজনৈতিক সভ্যতা মন্দিরে লোভের মূর্তি বসায়, আর দেশপ্রেমের নাম করে সেখানে পুজো চড়ায়। কিন্তু নেশনের নাম করে এ ভাবে মানবিকতা ও সভ্যতার রীতি ভাঙা যায় না।’ টোকিয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় জানালেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের জানা ছিল না, ভবিষ্যতে তাঁর দেশও এই রোগে ভুগবে। মানবিকতা, সভ্যতার রীতি ভেঙে জেএনইউ-এর কানহাইয়া কুমারকে আইনজীবীরা আদালতে ফেলে পেটাবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অসহিষ্ণুতায় রোহিত ভেমুলা নামে এক ছাত্র আত্মহত্যা করতে বাধ্য হবেন।
একশো বছর আগের এই বক্তৃতা জরুরি আর একটি কারণে। ভবিষ্যতে এটি রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজ্ম বইয়ে সংকলিত হবে, জাতিরাষ্ট্র ও হিংস্র জাতীয়তাবাদ নিয়ে তিনি পাঠককে সতর্ক করে দেবেন, কিন্তু সে সব অনেক পরের কথা। খবরের কাগজে রবীন্দ্রনাথের এই বক্তৃতার কথা পড়ে তার কয়েক মাস বাদেই ফরাসি লেখক রোমা রলাঁ তাঁর ডায়রিতে লিখবেন, ‘এই বক্তৃতাটি মানুষের ইতিহাসে একটি বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হবে।’ ভারতীয় ঐতিহ্য মানে শুধু গোমাতা ও দেশমাতার চরণে নৈবেদ্য অর্পণ নয়। ভারতের কবি জাপানে জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিচ্ছেন, সুদূর ইউরোপে বসে সেই বক্তৃতায় মথিত হচ্ছেন আর এক নোবেলজয়ী লেখক! জাতীয়তাবাদের ছানি-পড়া চোখে আইডিয়ার এই বিশ্বায়ন কোনও দিনই ধরা পড়বে না।
যিনি ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ লিখেছেন, তিনি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়ে উঠলেন কেন? ফাঁকিটা তত দিনে তাঁর চোখে ধরা পড়ে গিয়েছে। জাপান বক্তৃতার পরের বছর ১৯১৭ সালে প্রকাশিত ন্যাশনালিজ্ম বইয়ে লিখছেন: ‘দেশের জনতা যখন কোনও রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যে যান্ত্রিকতায় ভর করে সংগঠিত হয়, তাকে নেশন বলে।’ নেশন সুখদুঃখে সমব্যথী, হৃদয়ের সম্পর্কে গ্রন্থিত মানুষের সমাহার নয়, বরং এক যান্ত্রিক সংগঠন। মোদী, শাহেরা একেবারে ঠিক রাস্তায় হাঁটছেন। হৃদয়হীন যান্ত্রিক সংগঠন তৈরি করতে পারলেই পোয়াবারো। সকলে তখন এক রাস্তায় ভাববে, গরু খাওয়ার অভিযোগে মহম্মদ আখলাকদের পিটিয়ে মারবে।
রবীন্দ্রনাথ জানতেন, ক্ষমতার দম্ভেই এক নেশনের শত্রু হয়ে ওঠে আর এক নেশন। আমার থেকে অন্য নেশন বড় হবে, ইউরোপের কোনও নেশন চায় না। সে কারণেই প্রথম মহাযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) সময় ইউরোপীয় সভ্যতার মুখোশের আড়াল থেকে মানুষখেকো, রক্তপিপাসু স্বরূপ আত্মপ্রকাশ করছিল। সাধারণ মানুষ এ সব ভাবলে অমিত শাহদের সাড়ে সর্বনাশ। কথায় কথায় পাকবিরোধী জিগির, স্বাধীনতা দিবসে সংসদের সামনে ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে রাষ্ট্রের দম্ভই প্রশ্নের মুখে দাঁড়াবে।
সেই প্রশ্নটা ইতিমধ্যেই তুলে দিয়েছেন কর্নাটকের অভিনেত্রী ও প্রাক্তন সাংসদ রামাইয়া। পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে বলেছেন, ‘পাকিস্তান নরক নয়। সে দেশের মানুষেরাও আমাদের মতো। মাঝে সীমান্ত রয়েছে বলেই ওঁদের ঘৃণা করার দরকার নেই।’ অমনি সোশাল মিডিয়া ফেটে পড়েছে রাগে, একেবারে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে রামাইয়ার নামে মামলাও ঠুকে দেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ একশো বছর আগে জাতীয়তাবাদের এই হিংস্র, স্বার্থান্ধ নখদাঁত থেকেই সাবধান করে দিতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানের বিরোধিতা না করলে যেন ভারতীয় রাষ্ট্রের অস্তিত্বই থাকে না!
হীরক রাজার জাতীয়তাবাদে অবশ্য প্রশ্ন তোলার পদ্ধতিটাই নিকেশ করে দেওয়া হয়। অমিত শাহ যেমনটি করেছেন! জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করা হাল আমলে কিছু লোকের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাঁদের বুঝতে হবে, সংবিধান বাক্স্বাধীনতার অধিকার দিলেও জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার দেয়নি, কারণ জাতীয়তাবাদ আমাদের সংবিধানের কেন্দ্রে, জাতীয়তাবাদের জন্যই আমরা স্বাধীন হয়েছি— কথামৃত ছড়িয়েছেন। কোনও লাভ হবে না জেনেও তাঁকে রবীন্দ্রনাথের একটি কথা শুনিয়ে দেওয়া যাক। জাপান যাওয়ার আগের বছর, ১৯১৫ সালেই রবীন্দ্রনাথের একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল: ঘরে বাইরে। সেখানে নিখিলেশ এক জায়গায় বলেছিল, ‘দেশকে সাদা ভাবে দেশ বলে জেনে যারা তার সেবা করতে উৎসাহ পায় না, চিৎকার করে মা মা বলে, দেবী বলে মন্ত্র পড়ে, তাদের সেই ভালবাসা দেশের প্রতি তেমন নয়, যতটা নেশার প্রতি।’ বিজেপির জাতীয়তাবাদী কারুবাসনা এখন বুঝি নিখিলেশের গর্দান নেবে! কিংবা রবীন্দ্রনাথ থেকে সত্যজিৎ সবাইকে নিষিদ্ধ করে দেবে!
কিন্তু তার আগে নিষিদ্ধ করতে হবে নাইট উপাধি ত্যাগে রবীন্দ্রনাথের চিঠি। সেখানে তিনি ‘নেশন’, ‘ন্যাশনালিস্ট’ গোছের শব্দ এক বারও লেখেননি। জেনারেল ডায়ার অসহায়, নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছেন, তাঁর ‘সন্ত্রাসের নির্বাক যন্ত্রণা’ সেই কারণেই। মোদী, অমিত শাহের জাতীয়তাবাদ বুঝবে না, শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথ অক্সফোর্ডে হিবার্ট লেকচার দিতে গিয়েও ‘মানুষের ধর্ম’-র কথা বলেন, ‘মানুষের দায় মহামানবের দায়, কোথাও তার সীমা নেই।’ জাতীয়তাবাদ বলে, মানুষের দায় সামান্য, অন্য দেশকে দাবিয়ে রাখলেই হল। জাতীয়তাবাদ বিজেপির ধর্ম হতে পারে, মানুষের ধর্ম নয়।
দুনিয়ায় অবশ্য এই নির্বোধ জাতীয়তাবাদের পাল্লা ভারী। একশো বছর আগে টোকিয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষণ। ১১ জুন, ১৯১৬। বিকেল চারটেয় বক্তৃতা, কিন্তু দুপুর দেড়টা থেকে প্রেক্ষাগৃহ কানায় কানায় ভর্তি। ‘নেশন নৈতিক অন্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে দেশপ্রেমকে অনুসরণ করলে মৃত্যুই তার ভবিতব্য’ ইত্যাদি নানা কথা বলেছেন। কঠিন কথাগুলি জাপানের পছন্দ হয়নি। পর দিন সেই সভায় উপস্থিতদের মধ্যে ৮৭ জনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল খবরের কাগজ। ২১ জন বলেছিলেন ‘নো কমেন্টস’। আর ৩৫ জনের উত্তর ছিল, ‘খুব খারাপ।’ অধিকাংশ জাপানি সাংবাদিক লিখলেন, পরাধীন দেশের লোকেরা এ রকম আগডুম-বাগডুম বকে। সফর শেষে জাপান থেকে যে দিন ফিরছেন কবি, দেখা গেল, স্টেশনে মাত্র তিন জন।
গুজরাতের সন্তান মোদী, অমিত শাহদের অবশ্য একটি উজ্জ্বল উদ্ধার আছে। জাতীয়তাবাদ দিয়ে যে ভাবে তাঁরা সব কিছু গুলিয়ে দেওযার চেষ্টা করেছেন, তাতে রবীন্দ্রনাথ একাকী নিঃসঙ্গ নির্বাসনে যেতেন না। তাঁর সঙ্গে আর এক গুজরাতিও দেশছাড়া হতেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব বলতেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে মহাত্মা। তিনি বলেছিলেন, ‘ঘৃণা কখনওই জাতীয়তাবাদের আবশ্যক উপাদান নয়। জাতিতে-জাতিতে ঘৃণা চলতে থাকলে একটা দেশের ‘ন্যাশনাল স্পিরিট’ই নষ্ট হয়ে যায়।’
রবীন্দ্রনাথ, গাঁধী সকলকে বিসর্জনে পাঠিয়ে এই জাতীয়তাবাদ নিয়ে যে দেশ কী করবে, নরেন্দ্র মোদীরাই জানেন!