Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ই-পেপার

শ্রমিকের অধিকার কেড়ে বাজারের ভাল হতে পারে না

সুপর্ণ পাঠক
১২ মে ২০২০ ২০:২২
ছবি: রয়টার্স।

ছবি: রয়টার্স।

সহজ রাস্তাটা ধরা সহজ। কিন্তু কঠিন রাস্তাটা সহজ করে হাঁটা বোধহয় সত্যি কঠিন। লকডাউনের পরে শিল্পের চাকা ঘোরাতে উত্তরপ্রদেশ তাই সহজ রাস্তায় হাঁটাটাই বেছে নিয়ে কর্মীদের সব অধিকার কেড়ে নিয়েছে। শিল্পমহল নাকি তাতে উচ্ছ্বসিত। যদিও আরএসএস সমর্থিত ভারতীয় মজদুর সংঘ চটে লাল। বাকি শ্রমিক ইউনিয়নগুলির সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারাও বলছে এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের পরিপন্থী। কারণ, যে ভাবে এই আইনে শ্রমিকের অধিকার খর্ব করা হয়েছে তাতে ভারতের ভাবমূর্তি তলানিতে।

কোথাও গিয়ে এই অনুভূতি যে শ্রমবিষয়ক সংসদীয় কমিটিকেও স্পর্শ করে গিয়েছে তাও পরিষ্কার। সম্প্রতি এই কমিটির চেয়ারম্যান ও বিজু জনতা দলের সাংসদ ভর্তুহরী মহতাব সব রাজ্যের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে তাঁদের মতামত জানতে চেয়েছেন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন— কমিটির পরবর্তী বৈঠকেই এই মতামত যাচাই করে নিতে আগ্রহী তিনি।

বাজারমুখী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল সূত্রটি হল কম খরচে বেশি উৎপাদন। কিন্তু কম পয়সায়, শ্রমিককে বঞ্চনা করে লাভের রাস্তাটা কিন্তু সামন্ত্রতান্ত্রিক বলেই, সব বাজারমুখী দেশেই শ্রমিক সুরক্ষা আইন চালু আছে। আর এই সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা আটকাতেই ভারতে এত আইন তৈরি হয়েছিল। এটাও অনস্বীকার্য যে, সময় এসেছে শ্রম বিষয়ক কয়েকশো আইনকে সহজ করে তোলার। কিন্তু তা করতে হবে বাজার ব্যবস্থাতে স্বীকৃত শ্রমিকের অধিকারকে রক্ষা করেই।

Advertisement



সংবিধান অনুযায়ী শ্রম আইনের উপর রাজ্য ও কেন্দ্রের যৌথ অধিকার। এবং রাজ্যের আইন, সংবিধান মেনে, কেন্দ্রীয় আইনের বিরোধিতা করতে পারে না। একই সঙ্গে ভারতের শ্রম আইন নিয়ে প্রায় সব পক্ষই বিভিন্ন সময়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছে। এক উত্তরপ্রদেশেই ৩৮টি শ্রম আইন ছিল এত দিন, তার মধ্যে বাদ গেল ৩৫টি। এই আইন এখন কেন্দ্রের কোর্টে। কেন্দ্রের অনুমোদন পেলেই নাকি এই আইন উত্তরপ্রদেশে চালু হয়ে যাবে।

কিন্তু আপত্তির জায়গাটা কোথায়? অনেক। তার মধ্যে অন্যতম হল শ্রমিকের কাজের ক্ষেত্রে কোনও অধিকারই না থাকা। এমনকি যদি কোনও মালিক তাঁর কর্মীদের জন্য জল খাওয়ার ব্যবস্থা, ক্যান্টিন বা সাপ্তাহিক ছুটির ব্যবস্থাও না করেন, তা হলেও কেউ কিছু বলতে পারবে না। এমনকি এর কারখানার পরিবেশ স্বাস্থ্যকর রাখার দায়ও নাকি মালিকের থাকবে না!

খাতায় কলমে তিন বছর, কিন্তু অনেকেই মনে করছেন এই নতুন ব্যবস্থা হয়ত চিরকালীন করতে চাইবে সরকার। শ্রম সংক্রান্ত পুরনো সব আইন তুলে নিয়ে নির্মাণ শিল্পে প্রযোজ্য আইনটি, বন্ডেড লেবার অ্যাক্ট, ওয়ার্কমেন কমপেনশেসন অ্যাক্ট, পেমন্ট অব ওয়েজেস অ্যাক্টের সেকশন ৫ (যাতে সময় মতো মাইনে পাওয়ার অধিকার দেওয়া আছে) রেখে দিয়েছে উত্তর প্রদেশ সরকার। এবং শ্রমিকের কোনও অধিকার থাকছে না, মালিকের সঙ্গে বিরোধের ক্ষেত্রে আইনের সহায়তা নেওয়ার। আর এই জায়গা থেকে মালিকেরও কোনও দায় থাকছে না কাজের জায়গায় শ্রমিকদের জন্য বিন্দুমাত্র কোনও মানবিক সুবিধার ব্যবস্থাটুকু রাখা, এমনকি কাজ করতে গিয়ে আহত হলে প্রাথমিক চিকিৎসার মতো ব্যবস্থাপনার দায়ও নয়।



সবাই চাইছে অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে। এবং এটাও ঠিক যে কেউই চাইছে না তা করতে গিয়ে করোনার ছোবলে মরতে। কেন্দ্রীয় সরকারও নয়। তাই বাজার চালু করতে সরকার ধীরে চল নীতি নিয়েছে। প্রাথমিক ভাবে সরকারের নীতি অনুযায়ী করোনা-যুদ্ধে গড়ে প্রতি শিফটে ২৫ শতাংশ শ্রমিক নিয়ে উৎপাদন চালু করা যাবে। বিভিন্ন কারণে শিল্প পরিচালকরা এর বিরোধিতা করেছেন। তার মধ্যে অন্যতমটি হল— উৎপাদন চালু করলে তা লাভজনক হতে হবে। ২৫ শতাংশ শ্রমিক দিয়ে উৎপাদন কী ভাবে লাভজনক করে তোলা যাবে তার অঙ্ক তাঁরা মেলাতে পারছেন না। এটি বিস্তৃত আলোচনার অপেক্ষা রাখে। কিন্তু আমরা যদি মাথায় রাখি যে, কোনও সংস্থাই অতিরিক্ত কর্মী রেখে উৎপাদন চালায় না, তা হলেই এই যুক্তির সারমর্ম বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হবে না। কিন্তু ফেরা যাক উত্তরপ্রদেশ ও শ্রম আইন পরিবর্তনে।

যোগী সরকার আট ঘণ্টার শিফটকে দশ ঘণ্টা থেকে বারো ঘণ্টা করার অনুমতি দিয়েছে। শুধু তাই নয়। বলেছে প্রথম আট ঘণ্টার জন্য যে বেতন, সেই হারেই পরবর্তী ঘণ্টাগুলিতে বেতন পাবেন শ্রমিকরা। এ বার লাফিয়ে বাড়তে থাকা কর্মহীনতার প্রেক্ষিতে অঙ্কটা বোঝার চেষ্টা করি। কেন্দ্রীয় সরকার যে কোনও শিফটে গড়ে ২৫ শতাংশ কর্মী নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। সম্ভবত উত্তরপ্রদেশ সরকারের অঙ্কটা হল— যদি ২৫ শতাংশ কর্মী নিয়ে কাজ করতে হয়, তা হলে শিফট পিছু ২৫ শতাংশ উৎপাদন কম হবে। তা হলে কাজের সময়টা ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিলে এই সমস্যাটা মিটে যাবে! বারো ঘণ্টা করলে আরও বেশি।



পাটিগণিতের অঙ্কে কারখানা চলে না। কারখানা লাভজনক ভাবে চালানোর অঙ্ক নির্ভর করে প্রযুক্তির উপর। আর আজকের দিনে যখন উৎপাদন চালাতে কেউই অতিরিক্ত শ্রমিক রাখে না, তাতে এই অঙ্ক আপাত দৃষ্টিতে নিভৃতবাস ও উৎপাদনের প্রয়োজনের যৌক্তিক মিশ্রণ বলে মনে হলেও আসলে তা নয়। সহজ পাটিগণিতে এই অঙ্ক মেলানো যাবে না। সেই কারণেই শিল্পপরিচালকরা বলেছেন এই ভাবে উৎপাদন শুরু করলে সংস্থার ক্ষতি বই লাভ হবে না।

উল্টো দিকে শ্রমশিবিরের যুক্তি হচ্ছে, আগামী তিন বছর ধরে শ্রমিকের কোনও অধিকারই থাকবে না। সরকারের যুক্তি মেনে নিলে, আট ঘণ্টার শিফট চালু রেখে একাধিক শিফটের ব্যবস্থা করলে তো উৎপাদনের খরচ বাড়ছে না। সহজ পাটিগণিতে অঙ্ক যে ভাবে সরকার করেছে, তাতে আট হোক বা ২৪, ঘণ্টা পিছু শ্রমিক খরচ তো কারখানায় একই থাকছে। উল্টে আট ঘন্টার শিফট থাকলে কর্মহীনতার বাজারে আরও বেশি কিছু শ্রমিকের পেটে অন্নের ব্যবস্থা হত।

কিন্তু ইঙ্গিতে উত্তরপ্রদেশ সরকারের যুক্তি বোধহয়, শ্রম বিরোধ আইন বিলোপ করা হয়েছে। আগামী তিন বছর কোনও শ্রমবঞ্চনার বিরুদ্ধে কোনও আইনি প্রতিবাদের রাস্তা খোলা থাকছে না। তাই যেমন খুশি কারখানা চালিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নাও। মধ্যপ্রদেশ এবং গুজরাটও হাঁটছে উত্তরপ্রদেশের রাস্তাতেই। আর তৈরি হচ্ছে নতুন শ্রম অশান্তির রাস্তা।



সরলীকরণের দায় নিয়ে বলা যায়, এই আইন বলবত্ হলে উত্তরপ্রদেশে যে কোনও মালিক তাঁর শ্রমিককে যদি ঘণ্টায় ১০ টাকাও মজুরি দেন, তা হলেও কেউ কিছু বলতে পারবে না! কারণ ন্যূনতম মজুরির আইনও কলমের এক খোঁচায় উত্তরপ্রদেশে বাতিল হয়ে গিয়েছে। আইন বদলানোর যুক্তি দেখিয়ে সেই রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী স্বামী প্রসাদ মৌর্যের দাবি, অর্থনীতি চালু করার জন্যই শ্রম আইনে এই পরিবর্তন অনিবার্য ছিল।

কিন্তু যে বাজারের যুক্তিতে শ্রমিকদের অধিকারের উপর কোপ মারা হচ্ছে, সেই বাজারের যুক্তিই বলছে— আইন পরিবর্তনের এই দিশা উন্নয়ন বিরোধী। ২০১৬ সালের পর থেকে ভারতে আয় বৈষম্য বাড়ছে। ভারতের সম্পদের ৭৭ শতাংশ, জনসংখ্যার ১০ শতাংশের অধিকারে। ২০১৭ সালে ভারতে যে সম্পদ সৃষ্টি হয়েছিল, তার ৭৭ শতাংশ অধিকার করে ছিলেন বড়লোকদের শীর্ষে থাকা ১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের সাম্প্রতিক আর্থিক নীতির পরিমণ্ডল কিন্তু বাজারকে সংকোচনই করছে সম্পদ বৈষম্যকে বাড়তে দিয়ে।

যদি আগামী তিন বছর এই আইন চালু থাকে, তা হলে দেশে আয় বৈষম্য বাড়বে আরও বেশি। ভারতের শ্রম আইন নিয়ে আপত্তির অন্যতম জায়গাটি ছিল বাজার খারাপ হলে উৎপাদন কমাতে হয়, কিন্তু তাল মিলিয়ে কর্মী কমানো যায় না দেশের শ্রম আইনের কারণেই। এ ব্যাপারে সব সময়ই পশ্চিমি উদাহরণ টানা হয়ে থাকে এবং বাজার অর্থনীতির যুক্তি টেনে কর্মী ছাঁটাইয়ের সুযোগ চেয়ে এসেছে শিল্প।



কিন্তু বাজার অর্থনীতি এই যুক্তি মানলেও, পাশাপাশি কিন্তু সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থার কথাও বলে এসেছে। রাষ্ট্রের অধিকার যেমন কর নেওয়ার তেমনই তার দায় নাগরিকের সুরক্ষার ব্যবস্থা করারও। হাতের কাছেই রয়েছে ২০০৮ সালের উদাহরণ। সাবপ্রাইম সংকটে যখন গোটা মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, কর্মহীনতা বাড়ছে, ব্যাঙ্ক ঝাঁপ ফেলছে, বিশ্ব জুড়ে মন্দা— তখন কিন্তু বারাক ওবামা নাগরিকের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না কমিয়ে বরং আরও দৃঢ় করে তোলার উপর নজর দিয়ে নাগরিকদের এবং দেশকে বাঁচিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: যুক্তি না মানলে কোনও মঙ্গলময়ের ক্ষমতা নেই এই অন্ধকার দূর করার​

উত্তর প্রদেশের সরকার কিন্তু এই যুক্তিতে কান না-দিয়ে হেঁটেছেন উল্টো রাস্তাতেই। অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর পুরো দায়টাই শ্রমিকের ঘাড়ে দিয়ে। সামাজিক সুরক্ষার দায় সম্পূর্ণ ভাবে এড়িয়ে। ভারতে সামাজিক সুরক্ষার হাল করোনাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আজ যদি এই বৈষম্য এত তীব্র না হত, তা হলে কিন্তু সরকারের কোষাগারেও এত চাপ পড়ত না। কারণ, সমবন্টনের এই বিকট বৈষম্য না থাকলে অনেক বেশি সাধারণ মানুষের হাতে কিছু সঞ্চয় থাকতই এই অতিমারির ভয়ানক সময়ে খেয়ে পরে বাঁচার।

শ্রম আইনের এই পরিবর্তন করা হচ্ছে বিনিয়োগ টানতে। যেন বলা হচ্ছে, “এসো, আমরাও কম পয়সায় চিনের মতো উৎপাদন করতে দেব।” কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ তা শুনবে তো! আমরা যদি বিনিয়োগকারীর স্বার্থের প্রেক্ষিতেই এই শ্রম আইন সংশোধন মাথায় রাখি, তা হলেও কিন্তু একটা কাঁটা খচখচ করছেই।



আজ যদি এমন আইন আমরা মেনে নিই যাতে শ্রমিকের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় এবং তাঁদের আয় কমে তা হলে কিন্তু বাজারও সংকুচিত হবে একই হারে। তৈরি হবে শ্রম অশান্তির পরিসরও। সেটা কতটা বাজারমুখী চিন্তা তার যুক্তি এখনও আমরা শুনিনি, নেট দুনিয়ায় দাবি বা পাল্টা দাবির বাইরে। মনে রাখা ভাল— শ্রম অশান্তি কিন্তু বিনিয়োগ তাড়ানোয় ওস্তাদ। পশ্চিমবঙ্গ তার অন্যতম উদাহরণ।

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

আরও পড়ুন

More from My Kolkata
Advertisement