ভারতের বিদেশ নীতি নির্ধারকদের জন্য ২০২৫ সালটি স্থিতিশীল কূটনীতি নয়, বরং একের পর এক ধাক্কার বছর হিসাবেই অতিবাহিত হয়েছে। হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন থেকে শুরু করে ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলে অস্থিরতা এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক সংঘাত পর্যন্ত— তার অনেক ধারণাকেই পরীক্ষিত হতে দেখেছে দিল্লি। এমতাবস্থায় গত বর্ষশেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জর্ডন, ইথিয়োপিয়া এবং ওমান সফরটি ছিল পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্ককে জোরদার করার একটি ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি ঘটল এমন এক সময়ে যখন এই অঞ্চলে এবং বিশ্ব বাণিজ্যে আমেরিকা-নেতৃত্বাধীন গুরুতর ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। তা ছাড়া, তিনটি রাষ্ট্রই ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর অন্তর্ভুক্ত, যার নেতৃত্ব ভারত পেতে চায়। পাশাপাশি নিজেদের অঞ্চলে এদের প্রত্যেকেরই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
লক্ষণীয়, সফরের প্রথম পর্ব জর্ডন, বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব বহন করে দিল্লির ক্ষেত্রে। জর্ডনের কৌশলগত অবস্থান এবং মধ্যপন্থী রাজনৈতিক মনোভাব এটিকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে একটি অনন্য ভূমিকা প্রদান করে। ফলে আম্মানকে একটি স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবেই দেখে দিল্লি। কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫তম বার্ষিকীর সফরকালে বর্ধিত বাণিজ্যের উপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি, রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লা-র সঙ্গে গাজ়া-সহ আঞ্চলিক ঘটনাবলি এবং সন্ত্রাসবাদ দমন নিয়ে মোদীর আলোচনা হয়। সফরে দ্বিতীয় পর্যায়ে রাজধানী আদ্দিস আবাবা-য় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইথিয়োপিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারি’র একটি রূপরেখা তৈরি করেন। ২০২৪-এর জানুয়ারিতে ইথিয়োপিয়ার ব্রিকস জোটে সদস্যপদ লাভে বিশেষ ভূমিকা ছিল ভারতের। ইথিয়োপিয়ায় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারত তৃতীয় বৃহত্তম উৎস হলেও, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং সামরিক ক্ষেত্রে আদ্দিস আবাবার সঙ্গে চিন ও তুরস্কের সম্পর্ক আরও গভীর। আফ্রিকার এই দ্বিতীয় জনবহুল রাষ্ট্রটির সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আরও জোর দিতে হবে দিল্লিকে। অন্য দিকে, ওমানে গিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের গভীরতর অংশীদারিকে নিশ্চিত করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। সফরকালে ওমানের সঙ্গে একটি কম্প্রিহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। পাশাপাশি চুক্তিটি ভারতীয় নির্মাতাদের জন্য আফ্রিকায় এবং ইউরোপের কিছু অংশে পণ্য পুনঃরফতানির পথ খুলে দিতে পারে। বস্তুত, আমেরিকার উচ্চ শুল্কের প্রভাব কমাতে রফতানির গন্তব্য প্রসারিত করতে ভারতের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেও এই পদক্ষেপকে দেখছেন অনেকে।
জর্ডন, ইথিয়োপিয়া এবং ওমান— তিনটি রাষ্ট্রই পশ্চিম এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর ত্রিদেশীয় সফর ভারতীয় বিদেশনীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি তুলে ধরেছে— পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা, আফ্রিকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভারত মহাসাগরে সংযোগ স্থাপন। সাম্প্রতিক কালে পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকায় চিন ও পাকিস্তান তাদের কার্যকলাপ বৃদ্ধি করার ফলে নিশ্চিন্তে থাকার সুযোগ নেই দিল্লির কাছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)