E-Paper

গণশত্রু

প্রশ্ন করতে শেখানো যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবশ্যকর্তব্য, এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারাই শিক্ষার চূড়ান্ত অর্জন, এই কথাগুলি এখন আর ‘বৈধ’ বলে বিবেচিত হয় না।

শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:০১

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদে শামিল হবে, তাকেই ঈশ্বরের শত্রু বলে গণ্য করা হবে— এবং, ঈশ্বরের শত্রুর শাস্তি হল মৃত্যু। না, এই কথাগুলি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উচ্চারণ করেননি, করেছেন ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মহম্মদ মোভাহেদি আজ়াদ। তবে, জেএনইউ কর্তৃপক্ষ খুব পিছিয়ে নেই— রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলায় ছাত্রদের বিরুদ্ধে এফআইআর করার জন্য পুলিশকে বলেছেন তাঁরা। জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসে ঘৃণার কোনও স্থান নেই। এ কথা অস্বীকার করার প্রশ্নই ওঠে না যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা বা বেআইনি কার্যকলাপ কখনও সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু, জেএনইউ-এর ছাত্ররা বিশৃঙ্খল ছিলেন, অথবা আইন ভঙ্গ করছিলেন, কর্তৃপক্ষ সে দাবি করেননি। তাঁরা প্রতিবাদ করছিলেন— উমর খালিদ ও শরজিল ইমামের জামিন প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলেন। প্রতিবাদ কবে থেকে ঘৃণায় পরিণত হল, সে কথা কর্তৃপক্ষ বলেননি। বলার প্রয়োজনও নেই। কেউ বলতেই পারেন যে, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রের প্রশাসনিক শীর্ষ স্তরে যাঁরা অধিষ্ঠান করছেন, তাঁদের প্রধান যোগ্যতা গৈরিক বাস্তুতন্ত্রের প্রতি অবিচলিত নিষ্ঠা। সেই বাস্তুতন্ত্রের দুই শীর্ষকর্তার বিরুদ্ধে স্লোগানে তাঁরা আপত্তি না জানালে, ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ না জানালে নিষ্ঠা প্রকাশে ঘাটতি হয়, আর তাতে পদ খোয়ানোর ঝুঁকি। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের পিছনে পুলিশ লেলিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। বাইরের যে কোনও আক্রমণ থেকে, বিশেষত রাজরোষ থেকে, প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের রক্ষা করা যে কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক কর্তব্য— তাঁরা তা অবলীলায় ভুলেছেন।

এই ব্যাখ্যাটি ভুল নয়, তবে একমাত্রও নয়। বস্তুত, প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা যতই পদলোভী হোন না কেন, রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশের যে বাধ্যবাধকতাই তাঁদের থাকুক না কেন, এ-হেন আচরণের ক্ষেত্রে তা গৌণ কারণ হিসাবেই বিবেচিত হবে। গত এক দশকে গৈরিক বাস্তুতন্ত্র বৈধতা-অবৈধতার যে বয়ান তৈরি করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আচরণ তার অনুসারী— সম্ভবত, শাসকের বিরুদ্ধে ছাত্রদের যে কোনও প্রতিবাদ অবৈধ, কর্তৃপক্ষ এই কথাটিতে অন্তর থেকে বিশ্বাস করে বসেছেন। সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ যে কোনও উপলক্ষে এই অবস্থানের সপক্ষে প্রচার চালায়; দক্ষিণপন্থী আইটি সেলের প্রচার তো আছেই। সমাজের একটা তাৎপর্যপূর্ণ অংশও এই কথাটিতে বিশ্বাস করে বসেছে গত দশ বছরে। ফলে, প্রতিবাদী ছাত্রদের বিরুদ্ধে অযথা কঠোর ব্যবস্থা করলে তার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভয় আর নেই বললেই চলে। অতএব, প্রশ্ন করতে শেখানো যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবশ্যকর্তব্য, এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারাই শিক্ষার চূড়ান্ত অর্জন, এই কথাগুলি এখন আর ‘বৈধ’ বলে বিবেচিত হয় না।

গত দশ বছর ভারতবাসীকে আরও একটি কথা প্রাণপণে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে— দেশ আর দেশের শাসক যে এক নয়, এই কথাটি। সর্বাধিপত্যকামী শাসকের অভীষ্ট এই বিস্মৃতিই, যেখানে শাসকের বিরোধিতাকে দেশের বিরোধিতা বললে কেউ আপত্তি করবে না। যাঁরা শাসকের অন্যায়ের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন, তাঁরা যে নিজেদের বিপন্ন করেও গণতন্ত্রের পক্ষে, সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলে চলেছেন— দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সর্বাধিপত্যকামী শাসক এই কথাটি ভুলিয়ে দিতে চায়। এক বার সেই বিস্মৃতি অর্জিত হলে ‘গণশত্রু’ চিহ্নিত করতে সমস্যা থাকে না। উমর খালিদ বা শরজিল ইমাম যেমন সেই ‘গণশত্রু’— তাঁদের জামিনের দাবিতে যাঁরা স্লোগান দেন, গণশত্রু তাঁরাও। ভারতে দক্ষিণপন্থী বাস্তুতন্ত্র এই কাজটি করতে বহুলাংশে সক্ষম হয়েছে। এক দশক আগে জেএনইউ-এ রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনে দেশ জুড়ে যে সাড়া পড়েছিল, আজ তার অংশমাত্রও পড়ে না। ‘ইরান’ হয়ে ওঠার জন্য এই বিস্মৃতি, এই নৈঃশব্দ্যের গুরুত্ব কতখানি, রাষ্ট্রশক্তি জানে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Iran Ruler

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy