E-Paper

নান্যঃ পন্থাঃ

পরিবেশের প্রশ্নে আমেরিকা যে-হেতু আর আলোচনার টেবিলে নেই, তাকে বাদ দিয়েই নিজেদের দায়িত্বের রূপরেখা নতুন করে রচনা করা যায়।

শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:১৩

মোট ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংগঠন ও জোট ছেড়ে বেরিয়ে গেল আমেরিকা। ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট-এর ঘোষণাটি সাম্প্রতিক, তবে সিদ্ধান্তটি নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই জানিয়েছিলেন, যে সব ‘আন্তর্জাতিক সংগঠনের পিছনে অহেতুক খরচ হয়, যেগুলি অকার্যকর, বা আমেরিকার স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর’, সেই সব সংগঠন ছেড়ে বেরিয়ে যাবে আমেরিকা। এই তালিকায় রয়েছে আন্তর্জাতিক পরিবেশ গবেষণা ও কূটনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দু’টি সংগঠন— রাষ্ট্রপুঞ্জের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি) এবং ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)। মুহূর্তটি আক্ষরিক অর্থেই ঐতিহাসিক— এই কারণে যে, বিশ্বের বৃহত্তম দূষণ সৃষ্টিকারী দেশটিকে আলোচনার টেবিলে চেপে ধরার সুযোগটুকুও আর রইল না। জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আমেরিকার ভূমিকা ঐতিহাসিক ভাবেই ন্যক্কারজনক। বিভিন্ন চুক্তি অনুসারে জলবায়ু খাতে তাদের যে টাকা দেওয়ার কথা, আমেরিকা কখনও সেই দায়িত্ব পালন করেনি— এবং, এই সচেতন অবহেলাটি শাসনক্ষমতার রাজনৈতিক রঙের সাপেক্ষে পাল্টায়নি, বারাক ওবামা থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প, সব শাসনকালেই পরিস্থিতি কম-বেশি এক রকম। খানিক ব্যতিক্রম ছিল জো বাইডেনের শাসনকাল, তবে তা আমেরিকার অন্য নেতাদের তুলনায় মাত্র।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক কূটনীতি একটি কথা স্পষ্ট করে দিয়েছে: তিনি কিছুরই পরোয়া করেন না। এই তালিকায় সবচেয়ে সহজ বিষয় পরিবেশ, কারণ সে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষতিকর পরিবেশ নীতির কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। বাকি পৃথিবীর জন্য যে কথাটি মারাত্মক, তা হল, আমেরিকার দূষণ কমবে না, বরং ট্রাম্পের বিবিধ নীতি ইঙ্গিত করছে, দূষণ বাড়বে। কিন্তু তার জন্য আমেরিকাকে দায় নিতে বাধ্য করার কোনও উপায়, এমনকি খাতায়-কলমেও, থাকবে না। শুধু পরিবেশ নয়, আমেরিকা প্রায় সব ক্ষেত্রেই এমন দায়বদ্ধতাহীন অবস্থানই নিয়েছে। গোটা দুনিয়া নীরব দর্শক, কারণ যেখানে রাষ্ট্রপুঞ্জ নামক প্রতিষ্ঠানটি নিতান্ত নখদন্তহীন অস্তিত্বে পর্যবসিত হয়েছে, সেখানে আমেরিকাকে শায়েস্তা করার একমাত্র উপায় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি, একমেরু বিশ্বে কোনও দেশ সে ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়। পরিবেশ কূটনীতিকেও এই বাস্তবই মেনে চলতে হবে। নান্যঃ পন্থাঃ।

তবে, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি শুধু হতাশারই নয়— একে নতুনতর ভবিষ্যতের ভিত্তিপ্রস্তর হিসাবেও কল্পনা করা যেতে পারে। পরিবেশের প্রশ্নে আমেরিকা যে-হেতু আর আলোচনার টেবিলে নেই, তাকে বাদ দিয়েই নিজেদের দায়িত্বের রূপরেখা নতুন করে রচনা করা যায়। বাকি উন্নত দেশগুলিও যে নিজেদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে অন্তত আংশিক ভাবে ব্যর্থ, এই স্বীকারোক্তির উপরে দাঁড়িয়েই নতুন শপথ গ্রহণ করতে হবে। চিনের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল দেশকে আরও দায়িত্ব নিতে হবে, নিচু দ্বীপরাষ্ট্রগুলির স্বার্থের কথা মাথায় রাখতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমেরিকার মহানিষ্ক্রমণ যাতে অন্য দেশগুলিকেও নিজেদের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলার পথ না-দেখায়, এই মুহূর্তে তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন হল, সে কাজে তাদের বাধ্য করবে কে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

america Donald Trump Oath

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy