E-Paper

ঘৃণাভাষী

সুপ্রিম কোর্ট ২০২৩ সালের এপ্রিলে সমস্ত সরকারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিল নিজের থেকেই যেন ঘৃণাভাষীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়, কোনও এফআইআর-এর অপেক্ষায় না থেকেই। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে কেউ তা করেননি, কেননা তিনি নিজেই রাজ্য প্রশাসনের সাক্ষাৎ শীর্ষমুখ।

শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪৭

দু’হাজার ছাব্বিশের ভারতে যে সব রাজ্যে বিধানসভা ভোট হচ্ছে, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের দিকেই গোটা দেশের নজর। কারণটি এত দিনে সকলেই জানেন। এই ফাঁকেনজর এড়িয়ে যাচ্ছে অসম প্রদেশের নির্বাচনী রাজনীতির কুৎসিত বাস্তব। সে রাজ্যে ভোট সমাপ্ত, ফল বেরোতে এখনও মে মাসের প্রথম সপ্তাহ অবধি অপেক্ষা। ইতিমধ্যে অসমের মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গে এসে তাঁর স্বভাবোচিত হিংসাভাষণে বিজেপিকে উদ্দীপ্ত করার ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাঁর দাবি, অসম ও ত্রিপুরা ‘ঘুসপেটিয়া’ অর্থাৎ মুসলিম ঠেকাতে দারুণ সফল, এ বার পশ্চিমবঙ্গের পালা। বিজেপি জিতলেই এ রাজ্যের সীমানা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চূড়ান্ত ব্যবস্থা করা হবে। কথাগুলি হুমকির মতো শুনতে লাগতে পারে, তবে অসমের মুখ্যমন্ত্রী আরও নিম্নরুচির ভাষা ও ভঙ্গিতেই কথা বলতে অভ্যস্ত। অসমে তিনিই সেখানকার অধিবাসীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন সে রাজ্যের মুসলমান বাসিন্দা যাঁদের স্থানীয় ভাবে মিঁয়া বলে অভিহিত করার চল, তাঁদের শিক্ষা দেওয়ার এক অর্থনৈতিক প্রয়াস দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে, যেমন অটো ভাড়া যা হওয়ার কথা, মিঁয়া অটোচালকদের তার থেকে অবশ্যই অনেকটা কম দিতে ইত্যাদি। অনবরত তিনি এই মিঁয়াদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে গিয়েছেন, তাঁদের নানা উপায়ে আক্রমণ করতে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর পদে থেকে, এত গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী হয়েও যে কেউ এত ঘৃণাভাষণ করে যেতে পারেন, এবং তার জন্য ন্যূনতম দাম তাঁকে দিতে হয় না, এই ঘটনা নরেন্দ্র মোদী শাসিত ঘৃণাতাড়িত ভারতেও একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। ‘ডগ হুইসলিং’ বলে যে শব্দবন্ধটি অধুনা চালু, তার জোরেই হিমন্তবিশ্ব শর্মা একক ও বিশিষ্ট হয়ে থেকে যাবেন।

সুপ্রিম কোর্ট ২০২৩ সালের এপ্রিলে সমস্ত সরকারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিল নিজের থেকেই যেন ঘৃণাভাষীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়, কোনও এফআইআর-এর অপেক্ষায় না থেকেই। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে কেউ তা করেননি, কেননা তিনি নিজেই রাজ্য প্রশাসনের সাক্ষাৎ শীর্ষমুখ। তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন একাধিক মানবাধিকার কর্মী। অথচ একের পর এক মানুষের বিরুদ্ধে অসমে এফআইআর করা হয়েছে— কেননা তাঁরা হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন থেকে সুরক্ষা চেয়েছিলেন। বিদ্বেষ ও ঘৃণাভাষণের প্রতি বর্তমান ভারত কতটাই উদাসীন— কার্যত ‘উদার’ ও অবাধ অধিকার দানে প্রতিশ্রুত, এই মুহূর্তে তার শীর্ষ নিদর্শন হিমন্তবিশ্ব। ‘গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ’ ভারতে শাসনব্যবস্থা ও বিচারব্যবস্থাকে কার্যত উপেক্ষা করে হিমন্তবিশ্ব তার নতুন মানদণ্ড তৈরি করে দিয়েছেন।

এবং বুঝিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান ভারতের শাসনব্যবস্থা ও বিচারব্যবস্থা কোনও মূল্যবোধ তুলে ধরার দায় থেকে নিজেদের অব্যাহতি দিয়েছে। হিমন্তবিশ্ব শর্মা যে কোনও ব্যক্তিমাত্র নন, তিনি একটি সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। অথচ লাগাতার প্রকাশ্য ত্রাসের বেসাতি করেও তিনি আদালতের রোষের মুখে পড়েন না, কেন্দ্রীয় সরকারের বাহবা কুড়ান। অথচ অন্যান্য রাজ্যের দিকে ধাবিত হয় কত না সতর্কবার্তা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ঠিক যে কারণে এই ভারতে অসম এসআইআর থেকে ছাড় পায়, সেই কারণেই কেন্দ্রীয় শাসক দলের কাছে হিমন্তবিশ্ব শর্মাও অতি বিশেষ ব্যক্তি। অসমের সংখ্যালঘু-দমনের অস্ত্র তিনি স্বয়ং।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Himanta Biswa Sarma Assam Hate speech

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy