E-Paper

অরণ্যকাণ্ড

পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে একই হিমালয়ের অন্য ঢালে নেপাল, ভুটানও ভুক্তভোগী। ঝাড়খণ্ড, নিকোবরেও খনির কারণে ভূপ্রকৃতিতে বদল এসেছে।

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৮
প্রকৃতির ভয়াল রূপ উত্তরাখণ্ডে।

প্রকৃতির ভয়াল রূপ উত্তরাখণ্ডে। ছবি: পিটিআই।

পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক দিক দিয়ে উত্তরাখণ্ড রাজ্যটি অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থানে রয়েছে। রাজ্যের ৭০ ভাগই বনভূমি এবং তা শুধু সৌন্দর্যের মণিহার নয়, বিপজ্জনক ও অস্থির ভূপ্রকৃতির নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা সংলগ্ন বিশাল এলাকার প্রাণভোমরাও বটে। শীর্ষ আদালত কয়েক বছর ধরেই হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের পার্বত্য এলাকার এই ভঙ্গুরতা নিয়ে সতর্কবার্তা শুনিয়ে চলেছে। উদ্বেগের কারণ বনভূমি ধ্বংস করে উন্নয়নকাণ্ড, বেআইনি নির্মাণের আগ্রাসন ও এই সকল অন্যায়ের প্রতি প্রশাসনিক নীরবতা, যা প্রত্যক্ষ মদতের দ্যোতক। উত্তরাখণ্ডের বনভূমি নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত মামলায় আদালতের পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাতেই হাজারো একর সংরক্ষিত বনভূমি জবরদখল হয়ে গিয়েছে। একই সঙ্গে অরণ্যের অধিকার আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষের স্বার্থরক্ষার পরিকল্পনাই আদালতের পরামর্শ। বার্তা স্পষ্ট— বন কোনও ‘রিয়াল এস্টেট’ নয়, লুণ্ঠন বরদাস্ত করা হবে না, পরিবেশ আইন, মানবাধিকার ও দুর্যোগ-প্রতিরোধকে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠতে হবে।

হিমালয় গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের ধারক ও রক্ষক। দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার কান্ডারি গঙ্গা, সিন্ধু ও ব্রহ্মপুত্রের মতো বৃহৎ নদীগুলির উৎস, মৌসুমি বায়ু তথা বৃষ্টির ধরনের নিয়ন্তা, হিমবাহগুলি জলবায়ু পরিবর্তনে গুরুত্ববহুল। তদুপরি, অসামান্য জীব-বৈচিত্রের আবাসস্থল। কিন্তু, প্লেট সংঘর্ষের ফলে গঠিত ভূকম্পপ্রবণ এই এলাকা সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে। অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়ণ এই স্থিতিকে বারে বারে চাপের মুখে ফেলছে। রুদ্রপ্রয়াগ ও টিহরি দেশের সবচেয়ে ভূমিধসপ্রবণ অঞ্চলের তালিকায় উঠে এসেছে। নিয়ন্ত্রণহীন রাস্তা নির্মাণ ও সুড়ঙ্গ খোঁড়ার ফলে চামোলি, জোশীমঠ ও চাম্বার মতো এলাকায় ভূমিধস প্রচুর। চারধাম মহামার্গ বিকাশ প্রকল্পের মতো উদ্যোগে লক্ষ লক্ষ গাছ কাটা পড়েছে, বিস্তীর্ণ বনভূমি ও উর্বর মাটি নষ্ট হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনে পরিস্থিতি জটিলতর। ২০২২-এ শুধু উত্তরাখণ্ডেই প্রায় ১০ কোটি পর্যটক আসেন, যা এলাকার ধারণক্ষমতার অনেক ঊর্ধ্বে। কংক্রিটনির্ভর নির্মাণ এলাকায় উষ্ণায়নের বিপদ আনছে, ভাঙছে বন্যপ্রাণ করিডর। হিমালয়ের বন উজাড় হওয়ার অর্থ সমতলে বন্যা, নদীর ছন্দ নষ্ট, কৃষি ও জলভান্ডারে সঙ্কট। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ধ্বংসচিত্র সব নজিরকে ছাপিয়ে গিয়েছে। কুলু-মান্ডি-মানালিতে বারংবার বন্যা, হিমাচল ও উত্তরাখণ্ডে ভয়ঙ্কর বর্ষায় বাসিন্দারা বিপন্ন, তীর্থযাত্রী, পর্যটকদের জন্যও ‘দেবভূমি’ এখন নিরন্তর মৃত্যুভূমি।

পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে একই হিমালয়ের অন্য ঢালে নেপাল, ভুটানও ভুক্তভোগী। ঝাড়খণ্ড, নিকোবরেও খনির কারণে ভূপ্রকৃতিতে বদল এসেছে। কিন্তু, পরিস্থিতি উত্তরাখণ্ড বা হিমাচলের সঙ্গে এত সীমাহীন সঙ্কটপূর্ণ নয়, এত ঘন ঘন বিপদ আসে না, মানুষের কাজকর্ম ও নীতিগত নানা সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার এমন প্রকট যোগাযোগও চোখে পড়ে না। স্পষ্ট হতে বাকি নেই যে, বর্তমান প্রশাসনের ‘উন্নয়ন’ ভাবনাই বড় কারণ, যেখানে বনভূমিকে পণ্যজ্ঞানে বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ছাড়পত্র অবাধ, পরিবেশ আইন শিথিল পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রশাসনের দর্শন স্পষ্ট। দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশের ভারসাম্যের চেয়ে তাৎক্ষণিক মুনাফা ও নাগরিক চাকচিক্যের প্রদর্শনীই আকাঙ্ক্ষিত। অতএব এই বিপর্যয়ের মিছিলের দায়ভার শুধু ‘প্রকৃতির খেয়াল’-এরই নয়, অনৈতিক রাজনীতির সমীকরণও অঘটনের মূলে। বিচারবিভাগীয় সকল সুপরামর্শ ও ভর্ৎসনার উপেক্ষাই যখন এঁদের রীতি, তখন এই বিষচক্র ভাঙতে প্রয়োজন পাল্টা রাজনৈতিক প্রতিরোধ। প্রয়োজন মানবতাবাদী রাজনীতির অভ্যুত্থানের যা পরিবেশকে পণ্যের বদলে অমূল্য সম্পদ রূপে দেখবে। সেই পরিবর্তন না-আসা পর্যন্ত প্রকৃতির প্রতিশোধ চলতেই থাকবে, ভুগবে ভারত।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Natural Disaster himachal pradesh Uttarakhand

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy