E-Paper

শুরু আছে, শেষ নেই

আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নেতৃত্ব বদলে প্রকল্পের অবমূল্যায়ন, আর্থিক সমস্যা— ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন থেকে প্রকল্পের বাস্তবায়নের দূরত্ব বাড়িয়েই চলে। এই বিলম্বে জরুরি যন্ত্র এক জায়গায় আটকে থাকে, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের জীবনযন্ত্রণা ও রসিদের বহর বাড়ে।

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩০

রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন সমাসন্ন। অতএব, অভিনব সব পরিকল্পনা ঘোষিত হবে, আশ্চর্য হওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ নেই। সমস্যা হল, রাজ্যে পরিকল্পনা ঘোষিত হয়, কাজ শুরুও হয়, কিন্তু শেষ আর হয় না। বাঙালির এই সমস্যাটি রবীন্দ্রনাথ নির্ভুল চিহ্নিত করেন ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ প্রবন্ধে: “আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না” ইত্যাদি। সওয়া শতাব্দীর বেশি সময় কেটে গিয়েছে, বাঙালি ও বঙ্গ প্রশাসনের চরিত্র বদলায়নি। দীর্ঘলালিত কু-অভ্যাসের চড়া মূল্য দেন মানুষ। প্রতিশ্রুতিমতো উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, অসমাপ্ত প্রকল্পের ফলে এলাকা বেহাল হয়। এবং, পুরোটাই হয় তাঁদের করের টাকা অপচয় করে।

উদাহরণ, আদিগঙ্গার সংস্কার প্রকল্প। ২০১৫-য় বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থাপনা স্থাপনে আদালতের নির্দেশ, বার বার সময়সীমা দেওয়ার পরও দীর্ঘ এক দশকে কাজ থমকে রয়েছে নিকাশির নকশা তৈরির স্তরে। বিচারবিভাগের তাড়া ও কর্তৃপক্ষের তরফে তার প্রতিক্রিয়ার মধ্যে এই ফাঁক অতি উদ্বেগজনক। রাজ্য-কেন্দ্রের চাপানউতোর, জবরদখল, খাটালের সমস্যা, প্রকল্পের জন্য কলকাতা পুরসভার প্রস্তাবিত এবং এনএমসিজি-র বরাদ্দকৃত খরচের মধ্যে কয়েকশো কোটির ফারাক— হাজারো বিতর্কে আদিগঙ্গাকে বাঁচানোর লড়াই কেবলই দীর্ঘায়িত। ফলে, স্থায়ী পরিকাঠামোর অভাবে নিকাশি খাল দিয়ে বিপুল পলি ও বর্জ্য আদি গঙ্গায় এসে পড়ছে, অব্যাহত দূষণ-প্রবাহ। দুরবস্থার প্রতিচ্ছবি রাজ্যময়। সময়মতো অর্থ না আসায় ২০২৩-এর শেষে ঘটা-সহকারে ঘোষিত, উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির চালিকাশক্তি রূপে প্রচারিত কার্শিয়াং আইটি পার্ক প্রকল্পটিও আজ স্থবিরতার প্রতীক। নতুন রেললাইন এবং গুরুত্বপূর্ণ জংশনে তৃতীয় লাইন সম্প্রসারণ-সহ রাজ্যের বারোটি বড় রেল প্রকল্প থেমে রয়েছে মূলত জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে। কিছু ক্ষেত্রে, প্রয়োজনীয় হাজার হাজার হেক্টর জমির মধ্যে যৎকিঞ্চিৎই অধিগ্রহণ সম্ভব হয়েছে। শহরে নিত্যযাত্রীর দুর্ভোগ লাঘবে জরুরি মেট্রো সম্প্রসারণও জমিজটে একই তিমিরে। স্থানীয় বিরোধ, আইনি জটিলতায় যে কোনও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বড় জমি অধিগ্রহণ এ রাজ্যে বিভীষিকা।

আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নেতৃত্ব বদলে প্রকল্পের অবমূল্যায়ন, আর্থিক সমস্যা— ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন থেকে প্রকল্পের বাস্তবায়নের দূরত্ব বাড়িয়েই চলে। এই বিলম্বে জরুরি যন্ত্র এক জায়গায় আটকে থাকে, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের জীবনযন্ত্রণা ও রসিদের বহর বাড়ে। অপচয় হওয়া অর্থ কিন্তু রুগ্‌ণ এক রাজ্যে বিদ্যালয়ে, চিকিৎসালয়ে, পরিকাঠামোর বিকাশ ও চাকরি সৃষ্টিতে ব্যবহার করা যেতে পারত। অতএব, নির্বাচনী প্রস্তুতির সময়ে নির্বিচারে নতুন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি বিলোনোর আগে প্রশাসনকে পূর্ব-অনুমোদিত প্রকল্পগুলির সময়মতো সুসম্পাদনে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অনড় আমলাতন্ত্র ও ভোট রাজনীতির চক্করে কাজ ফেলে রাখার অভ্যাসটি রাজ্যের সংস্কৃতি রূপে প্রতিভাত হলে তা কিন্তু প্রশাসনিক দৌর্বল্য, আলস্য ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতারও দ্যোতক। সাধারণ মানুষ কিন্তু প্রতিশ্রুতি নয়, কাজকেই মনে রাখেন। বারে বারে প্রতিশ্রুতিভঙ্গ হওয়ায় তাঁরা আর আশা করতে সাহস পান না— কিন্তু, নাগরিকের এই প্রত্যাশাহীনতাকে রাজনীতি যদি ‘স্বাভাবিক’ অবস্থা বলে গ্রাহ্য করে, তবে তা অতি দুঃখের।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Election Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy