E-Paper

যুদ্ধের প্রভাব

অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পাশাপাশি আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ আগ্রাসন অবশেষে ইরানের মনোবল ভেঙে দেবে। অথচ, যুদ্ধের ফলে নেতৃত্বের উদ্ভব হয়েছে, তা আরও বেশি উদ্ধত ও আপসহীন।

শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:১৬

ইরান-সংঘাত শুরু হওয়ার দেড় মাসাধিক পরেও পরিস্থিতি এখনও শান্ত হয়নি। আমেরিকার ভুল পরিকল্পনা, পশ্চিম এশিয়ায় সহনশীলতা এবং পরিবর্তনশীল ক্ষমতার সমীকরণের এক জটিল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে এই যুদ্ধ। বস্তুত, এই যুদ্ধে আমেরিকার রণকৌশল বিষয়ে একটি দীর্ঘ দিনের ধারণা ভেঙে গিয়েছে যে, তারা উল্লেখযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশোধের শিকার না হয়েই বড় আকারের যুদ্ধ চালাতে পারে। গত কয়েক দশকেরও বেশি সময় ধরে, আমেরিকা এমন প্রতিপক্ষের উপরেই আঘাত হেনে এসেছে, যাদের আমেরিকার ভূখণ্ড বা সামরিক ঘাঁটিগুলোর উপর গুরুতর ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্রে আমেরিকার বাহিনীতে হতাহত অনেক হলেও, এমনকি তাদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হলেও, তাদের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পরিকাঠামোগুলি কোনও ধারাবাহিক বা পরিকল্পিত প্রতি-আক্রমণের শিকার হয়নি। এমনকি আমেরিকান ঘাঁটি থাকা তাদের আঞ্চলিক মিত্ররাও প্রতিহিংসার লক্ষ্যবস্তু হয়নি। ইরান-যুদ্ধ এ বারে সেই ধারণাটিকেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পাশাপাশি আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ আগ্রাসন অবশেষে ইরানের মনোবল ভেঙে দেবে। অথচ, যুদ্ধের ফলে নেতৃত্বের উদ্ভব হয়েছে, তা আরও বেশি উদ্ধত ও আপসহীন। এই নেতৃত্ব আমেরিকার শক্তির সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করেনি। পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা তৈরির পথ বেছে নিয়েছে। জানা গেছে, ট্রাম্প সরকার অভিযান টিকিয়ে রাখতে প্রতি দিন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এবং নির্ভুল যুদ্ধাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত এমন হারে খরচ করেছে যা সম্পূর্ণ রূপে পুনর্গঠন করতে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে। এ দিকে, ইরান এমন ব্যবস্থার উপর নির্ভর করেছে যা সস্তা, সম্প্রসারণযোগ্য এবং যার ঘাটতি পূরণ করা সহজ। যুদ্ধ চলাকালীন, উন্নত আমেরিকান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সত্ত্বেও ইরানের হামলায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান আমেরিকান ঘাঁটির অনেকগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাশাপাশি হরমুজ় প্রণালীর উপর তার ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ইরান কার্যকর ভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রবাহের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। ফলে, কয়েক দশক ধরে আমেরিকা উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেকে যে প্রধান নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, আজ আহত সেই ধারণা। তা ছাড়া, আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাবে আজ ভূ-রাজনৈতিক ভাবেও ওয়াশিংটন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

আপাতত ইরান-যুদ্ধে কোনও চূড়ান্ত বিজয়ী নির্ধারিত হয়নি। বরং এটি সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থিতিশীলতা এবং আধুনিক সংঘাতে উপলব্ধির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরই ইঙ্গিতবাহী। আমেরিকাকে আজ দুর্বল দেখাচ্ছে, সামরিক ভাবে না হলেও, বিশ্বাসযোগ্যতার দিক দিয়ে। আর, ইরান বিধ্বস্ত হলেও অটুট। সম্ভবত আরও বেশি দৃঢ়চেতা। সর্বোপরি, এই যুদ্ধ একটি সতর্কবার্তা যে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বই সামরিক সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। এখনকার গভীর ভাবে আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে, সংঘাতের পরিণতি খুব কমই যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে। আপাতত যুদ্ধবিরতি আগামী দিনে কার্যকর হবে কি না, জানা নেই। তবে, এই দেড় মাসাধিক যুদ্ধ যে শিক্ষা দিয়ে গেল, তা নিঃসন্দেহে জরুরি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

US-Israel vs Iran Donald Trump West Asia Iran-Israel Conflict

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy