E-Paper

প্রকৃত নাগরিক

সংশোধিত তালিকা থেকে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব বিচার হবে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে গঠিত কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থার দ্বারা।

শেষ আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ ০৬:৫০

সর্বোচ্চ আদালত জানিয়েছে যে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর) প্রক্রিয়াটি সাংবিধানিক এবং সম্পূর্ণ বৈধ। এই রায় নিঃসন্দেহে এসআইআর বিষয়ে রাজনৈতিক তরজায় ইতি টানবে। তবে বিরোধীদের দাবি, মৃত, অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত এবং তালিকায় একাধিক বার নাম থাকার কারণে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা বাদে অন্যান্য কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের যে নির্দেশ শীর্ষ আদালত দিয়েছে, তা ঘুরপথে এই নিবিড় সংশোধিত ভোটার তালিকাকে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি করে তুলছে। বিরোধীদের এই দাবির মধ্যে কতখানি সত্যতা আছে, দাবিটির সাংবিধানিক ভিত্তিই বা কতখানি, শীর্ষ আদালত সে বিষয়ে কোনও মতামত জানায়নি। তবে, এই রায়েই বলা হয়েছে যে, নাগরিকত্ব নির্ধারণের এক্তিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। সংশোধিত তালিকা থেকে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব বিচার হবে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে গঠিত কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থার দ্বারা। যাঁদের নাগরিকত্ব বিষয়ে সংস্থাটি সন্দিহান হবে, তাঁরা নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার সুযোগ পাবেন। তার পরও প্রমাণে ব্যর্থ হলে আটক শিবির, ও সম্ভবত শেষ অবধি দেশ থেকে বহিষ্কার। অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বার্থরক্ষার প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

কিন্তু, তার পরও কয়েকটি প্রশ্ন থেকে যায়। প্রথমত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যে অল্প সময়ের মধ্যে এসআইআর-এর কাজ হয়েছে, তাতে প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত হওয়া কার্যত অসম্ভব। সেই ত্রুটিপূর্ণ তালিকার কারণে এ বার যাঁরা ভোট দিতে পারলেন না, তাঁদের প্রত্যেকেই অবৈধ, এমন দাবি করাও কঠিন। বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ায় সেই নাম যাচাইয়ের কাজটিও ঢিমে তেতালায় চলেছে। শীর্ষ আদালতই জানিয়েছিল যে, এ বার ভোট দিতে না-পারলেও পরে ভোট দেওয়া যাবে। কিন্তু, ভোটদানের মৌলিকতম অধিকার থেকে এক বারের জন্য হলেও কোনও বৈধ নাগরিককে বঞ্চিত করা যে গণতন্ত্রের অবমাননা, সে কথা আরও দ্ব্যর্থহীন ভাবে অবশ্য শোনা যায়নি। এখন সেই এসআইআর প্রক্রিয়াই নাগরিকত্ব হরণের ভয় দেখাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ভোটার তালিকা এখন নাগরিকত্ব নির্ধারণের উপাদান হয়ে দাঁড়ালেও তার আসল কাজ এখনও প্রত্যেক বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। সে কাজে যেন ঢিলা না পড়ে। তৃতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গে দেখা গিয়েছে যে, ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’-র পিছনে বিবিধ আঞ্চলিক, ভাষাগত, সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ রয়েছে— যা এক জন বৈধ নাগরিকের ক্ষেত্রেও নাগরিকত্ব প্রমাণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আশা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের যে ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকার করবে, তা এই সমস্যাগুলির বিষয়ে যাতে সচেতন হয়, শীর্ষ আদালত তা নিশ্চিত করবে।

আরও একটি বিষয়ে বিশেষ সংবেদনশীলতা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় সরকার, নাগরিকত্ব নির্ধারণের ভারপ্রাপ্ত সংস্থা এবং অবৈধ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, আটক করা ও দেশান্তরিত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সব সংস্থাকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া কর্তব্য যে, যত ক্ষণ অবধি কোনও ব্যক্তি প্রশ্নাতীত ভাবে অ-নাগরিক সাব্যস্ত না-হচ্ছেন, তত ক্ষণ অবধি তাঁর প্রতি কোনও বৈষম্যমূলক আচরণ করা চলে না। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, একাধিক রাজ্যে সে প্রবণতা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। মনে রাখতে হবে যে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি জটিল, এবং স্বভাবতই দীর্ঘ। সে প্রক্রিয়া চলাকালীন কোনও ব্যক্তির নাগরিক অধিকার হরণ করার অর্থ, বিচারের আগেই শাস্তিবিধান। সরকার বা প্রশাসন যে এই কাজটি করতে পারে না, সে কথা বারে বারে স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি। সেই সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে নাগরিক এবং ব্যক্তির অধিকার এবং মানবাধিকার রক্ষায় শীর্ষ আদালত নজর রাখবে, গণতান্ত্রিক ভারতের প্রতিটি নাগরিক সে প্রত্যাশা করছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Citizenship Election Commission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy