মোট ১২০ ঘণ্টা। মাত্র এটুকু সময় লাগল চিংড়িঘাটায় মেট্রোর অনির্মিত ৩৬৬ মিটার পথ জুড়তে। তার জন্য বাইপাসে দু’দফায় যান চলাচল বন্ধও রাখতে হল। স্বভাবতই, তাতে শহর ভেঙে পড়েনি, এমনকি বাইপাস সংলগ্ন অঞ্চলও যানজটে স্তব্ধ হয়ে যায়নি। পুলিশ যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গেই ঘুরপথে যান চলাচল করিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে। গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিগত রাজ্য প্রশাসন এই কাজটি আটকে রেখেছিল। আদালত দিন বেঁধে দেওয়ার পরও কাজ এগোয়নি। অজুহাত দেওয়া হয়েছিল, শহরের অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা ইস্টার্ন বাইপাসের অতি গুরুত্বপূর্ণ মোড় চিংড়িঘাটায় রাস্তা বন্ধ করলে যাত্রীদের বিপুল অসুবিধা হবে। পূর্বতন সরকারের বক্তব্যটি ঠিক ছিল কি না, তা যাচাই করার একমাত্র পন্থা ছিল কাজটি করে দেখা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজি হননি। সরকার পাল্টানোর পরই চিংড়িঘাটায় কাজটি হল, এবং একেবারে হাতেকলমে প্রমাণ হয়ে গেল যে, আগের সরকার যে অজুহাতে এত দিন কাজ আটকে রেখেছিল, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
প্রশ্ন হল, পূর্বতন প্রশাসন এমন একটা ভিত্তিহীন বিশ্বাসে ভর করে এ-হেন গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ এত দিন ফেলে রাখল কী ভাবে? দু’টি সম্ভাবনা আছে— এক, প্রশাসন সত্যই জানত না যে, নির্বিঘ্নে এই কাজ সেরে ফেলা সম্ভব ছিল; এবং দুই, প্রশাসন বিলক্ষণ জানত, কিন্তু সরকারের রাজনৈতিক চাপে সে পথে হাঁটার সময় পায়নি। প্রথম সম্ভাবনাটি সত্য হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দক্ষতা ও কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে বিপুল প্রশ্ন ওঠে। আর, দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি সত্য হলে বলতে হয়, এ রাজনীতি ভয়ঙ্কর। মেট্রো রেল যে-হেতু কেন্দ্রীয় প্রকল্প, তার সাফল্যের কৃতিত্বও মূলত কেন্দ্রীয় সরকারেরই প্রাপ্য হবে— এমন একটি বিশ্বাস থেকেই এই রাজনীতির জন্ম। কোনও অছিলায় প্রকল্পটি আটকে রাখতে পারলে কেন্দ্রীয় সরকারকে সেই কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত করা যাবে, অতএব রাজ্যের পূর্বতন শাসকরা কাজটি করতে দেননি। সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ লঙ্ঘন— গণতন্ত্রে জনাদেশের এমন ভয়ঙ্কর অপব্যবহারের কোনও নিন্দাই যথেষ্ট নয়।
পূর্বতন শাসকরা সম্ভবত এখন টের পাচ্ছেন যে, তাঁদের এই পদক্ষেপটি কেবলমাত্র মানুষের পক্ষেই মারাত্মক ছিল না, তাঁদের পক্ষেও আত্মঘাতী ছিল। রাজ্য জুড়েই তাঁরা উন্নয়নের প্রশ্নটিকে রাজনৈতিক দ্বৈরথের পরিসরে পরিণত করেছিলেন। এবং, প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বার্থহানি হয়েছিল সাধারণ মানুষের। তাঁরা যে সেই আচরণ ভাল ভাবে নেননি, ভোটের ফলে তার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। মাত্র ১২০ ঘণ্টায়, এবং কার্যত বিনা সমস্যায়, চিংড়িঘাটার কাজ শেষ হওয়ায় প্রমাণ হল যে, এত দিন সে কাজ আটকে ছিল মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই। ভোট মিটে গেলেও সাধারণ মানুষ হিসাব রাখা বন্ধ করেননি। তাঁরা এই অনৈতিক আচরণের কথা বিলক্ষণ স্মরণে রাখবেন, এবং পরবর্তী কালে তৃণমূল কংগ্রেস যখন ফের ভোট চাইতে তাঁদের দরজায় কড়া নাড়বে, তখন তাঁরা এই আচরণের জবাবও চাইবেন। ক্ষুদ্র রাজনীতির বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার বিপদ হল, এক বার পিছলে পড়লে আত্মরক্ষা কার্যত অসম্ভব হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই কথাটি বহুমূল্যে শিখবেন বলে আশা করা যায়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)