E-Paper

প্রত্যাশিত

সাত-দশ দিনের মধ্যে যদি চার দফা মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, তবে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্তরে তার ধাক্কা ধাপে ধাপে লাগতে পারে না।

শেষ আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ ০৯:০৬
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হল সরকারি সিদ্ধান্তের অনুমানযোগ্যতা— কোন পরিস্থিতিতে সরকার কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, সে বিষয়ে নাগরিকের স্বচ্ছ ধারণা থাকা, এবং বাস্তবে সরকারি সিদ্ধান্ত নাগরিকের অনুমানের সঙ্গে মিলে যাওয়া। দেখা যাচ্ছে, অন্তত পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সুশাসনের পরীক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকার একশোয় একশো পাবে। পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তি শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারির শেষে। দুনিয়া জুড়ে চাপ পড়ল অপরিশোধিত পেট্রলিয়াম সরবরাহে। ভারতেও পেট্রোপণ্য বিপণন সংস্থাগুলির লোকসানের পরিমাণ বাড়তে থাকল। কিন্তু, দেশবাসী নিশ্চিত ভাবে জানতেন, যত ক্ষণ না চারটি বড় রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পর্ব মেটে, তেলের দাম এক পয়সাও বাড়বে না। বাড়েনিও বটে। ভোটপর্ব মিটতে প্রত্যাশা অনুসারেই তেলের দাম বাড়ল। তবে, এক বারে নয়— মূল্যবৃদ্ধি ঘটল মোট চার দফায়। অনুমানযোগ্যতার অনভ্যস্ত পরিসর ছেড়ে কেন্দ্রীয় সরকার ফিরল নাগরিককে চমকে দেওয়ার পরিচিত ছকে— নোট বাতিলের সময়ের মতো, অতিমারিজনিত লকডাউনের মতো। এখন প্রতি দিনই কৌতূহল— তেলের দাম কি আবার বাড়ল? ভোট না মিটলে তেলের দাম বাড়বে না, এই নিশ্চয়তার কারণটি সহজবোধ্য ভাবেই অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক। ভারতের ইতিহাস সাক্ষী, একাধিক অতি জনপ্রিয় নেতার পতন ঘটেছে তেলের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির কারণে। পশ্চিমবঙ্গ-সহ চারটি বড় রাজ্যে ভোটের মুখে প্রধানমন্ত্রী স্বভাবতই সে ঝুঁকি নেননি। কিন্তু, ভোট মিটে যাওয়ার পরে ধাপে ধাপে তেলের দাম বাড়ানোর যুক্তি কী, স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনও মেলেনি। সরকারি সিদ্ধান্তে নাগরিককে চমকে দেওয়ার রীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ভিন্ন অন্যতর উদ্দেশ্য থাকলে তা এখনও অজ্ঞাত।

যে যুক্তিগুলি শোনা যাচ্ছে, তা ধোপে টেকে না। প্রথমত, সাত-দশ দিনের মধ্যে যদি চার দফা মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, তবে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্তরে তার ধাক্কা ধাপে ধাপে লাগতে পারে না। বরং, কখন তেলের দাম আবার বাড়বে, এই আশঙ্কায় বাজার বর্তমানের চেয়ে চড়া মূল্যস্তরের প্রত্যাশা অনুসারে কাজ করতে পারে— ফলে, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হারে মূল্যস্ফীতি ঘটার আশঙ্কা থেকে যায়। তেলের দাম কতখানি বাড়ানো প্রয়োজন, সে বিষয়েও রাষ্ট্রকর্তাদের ধারণা অস্পষ্ট হওয়ার কথা নয়। পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তি আরম্ভ হওয়ার পর থেকে যতখানি মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, তার কত ভাগ ক্রেতাদের উপরে চাপানো হবে, আর কতটা দায় আপাতত রাষ্ট্র বহন করবে, সেই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হলে তেলের দাম নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে কোনও জটিলতা নেই। আন্তর্জাতিক বাজার অনিশ্চিত, দামের ওঠাপড়া চলবেই— দেশের অভ্যন্তরেও দাম সে ভাবেই বাড়বে-কমবে। বাজার ব্যবস্থায় এ ভাবেই দাম স্থির হওয়ার কথা। সে নিয়ম মেনে চলাই বিধেয়।

ডিজ়েলের দাম বাড়লে অর্থব্যবস্থায় সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির হার বাড়বেই, তা সংশয়াতীত। কিন্তু, ভারত যে-হেতু তেলের ক্ষেত্রে প্রবল ভাবে আমদানি-নির্ভর, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার প্রভাব ঠেকানোর কোনও উপায় নেই। তার উপরে, টাকার বিনিময় মূল্য ধরাশায়ী হওয়ার ফলে চাপ আরও বেড়েছে। অর্থব্যবস্থার পরিচালনা দক্ষতর হলে এই বিপদটি অন্তত আংশিক ভাবে হলেও এড়ানো যেত। তার চেয়েও বড় কথা হল, ভোটের মুখ চেয়ে প্রায় তিন মাস তেল বিপণন সংস্থাগুলির উপরে লোকসানের বোঝা চাপানো হল— যার ফলে সামগ্রিক লোকসানের পরিমাণ প্রায় দু’লক্ষ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই ক্ষতি শেষ পর্যন্ত রাজকোষের, অর্থাৎ দেশের জনগণেরই। এর ফলে কোনও না কোনও ভাবে উন্নয়ন ব্যয়ের বরাদ্দ প্রভাবিত হবে। তবে, আবারও, অনুমানযোগ্যতার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত পুরো নম্বর পাবে— দেশবাসী বিলক্ষণ জানেন, এই ভারতে রাজনীতি এসে অর্থনীতিকে নিয়ে যায়, এবং যেতেই থাকবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

US-Iran War Petrol price Diesel Price

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy