পশ্চিমবঙ্গে চারটি শ্রম বিধি দ্রুত চালু করার দাবি তুলেছে শিল্পমহল। সারা ভারতে যখন শ্রম বিধি বলবৎ হয়ে গিয়েছে, তখন এ রাজ্য তার বাইরে থাকলে নানা আইনি জটিলতা তৈরি হতে বাধ্য। স্বল্পমেয়াদি, নির্দিষ্ট সময়ের নিয়োগকেও চুক্তিপত্র, ইএসআই, ইপিএফ, ন্যূনতম বেতন প্রভৃতির অধীনে এনেছে শ্রম বিধি, যাতে অস্থায়ী কর্মীরা সুবিধা পান স্থায়ী কর্মীদের সমান। এর ফলে অস্থায়ী কাজগুলিও আসবে সংগঠিত ক্ষেত্রের অধীনে, এই হল সরকারের লক্ষ্য। তবে একটি বাস্তব সমস্যার কথা তুলেছে ইন্ডিয়ান স্টাফিং ফেডারেশন— আগে কর্মী জোগান এবং আউটসোর্সিং পরিষেবায় ১২% জিএসটি বসত, এখন তা বেড়ে ১৮% হয়েছে। খরচ কমাতে ছোট-মাঝারি সংস্থাগুলি অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকেই কর্মী নিয়োগ করছে। রাজ্যের ছোট ও মাঝারি শিল্পসংস্থাগুলি যাতে সংগঠিত ক্ষেত্রের সংস্থা থেকেই কর্মী নিয়োগ করে, তা নিশ্চিত করতে আউটসোর্সিংয়ের উপরে জিএসটি ১৮% থেকে কমিয়ে ৫% হোক, দাবি ইন্ডিয়ান স্টাফিং ফেডারেশনের।
সরকার মানব শক্তি সরবরাহ এবং শ্রম আউটসোর্সিংয়ের উপরে ১৮% জিএসটি আরোপ করে যে-হেতু এগুলোকে সাধারণ ব্যবসায়িক সহায়তা পরিষেবা হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অথচ, স্বাস্থ্য পরিষেবা, খুচরো ব্যবসা, ই-কমার্স এবং ওষুধশিল্পের মতো শ্রম-নিবিড় শিল্পগুলির মতে, তাদের ব্যবসা স্বল্প লাভ অথবা চূড়ান্ত পণ্যের উপরে ১৮%-এর কম জিএসটি হারে পরিচালিত হয়। এই ব্যবসাগুলির জন্য তাই ‘আউটসোর্স’ করা শ্রমশক্তির উপরে ১৮% কর একটি অতিরিক্ত বোঝা, যা তাদের কর্মী নিয়োগে নিরুৎসাহ করে। তা ছাড়া, সংগঠিত শ্রমিক নিয়োগের জন্য রিপোর্ট দাখিল, ডিজিটাল লগ রক্ষণাবেক্ষণ এবং জটিল কর বিধি মেনে চলা প্রয়োজন। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগ এই জটিল প্রশাসনিক ও কর প্রক্রিয়াগুলো এড়াতেও অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকে নিয়োগ করে। অন্য দিকে, কঠোর শ্রম আইন এড়াতে, কর কমাতে এবং পরিচালন ব্যয় কমাতে বহু বৃহৎ বাণিজ্যিক সংস্থাও অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকে লোক নিয়োগের পথে ঝোঁকে। এর ফলে ভারতে সংগঠিত ক্ষেত্রের মধ্যেও ক্রমাগত বেড়ে চলেছে অসংগঠিত ক্ষেত্র-সুলভ নিয়োগ— বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে সম্মানজনক শর্ত, নিরাপদ কর্ম-পরিবেশের পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে, বৈষম্যপূর্ণ এবং অসম্মানজনক শর্তে কাজ করতে হচ্ছে শ্রমিক ও কর্মচারীদের। স্বল্পমেয়াদে তা লাভজনক বলে মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা শ্রমিক এবং শিল্প, উভয়ের পক্ষেই ক্ষতিকর।
দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুস্থায়ী উন্নয়নের জন্য শিল্প, উৎপাদন, পরিষেবা-সহ সব ক্ষেত্রে আরও বেশি সংগঠিত কাজ তৈরি হওয়া দরকার। ন্যায্য, বিধিবদ্ধ নিয়োগ একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত, কারণ এটি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর আদায়ের পথ তৈরি করে। এই ধরনের সংগঠিত অর্থব্যবস্থায় উত্তরণের অন্যতম লক্ষ্য শ্রমিকদের জন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, চাকরির নিরাপত্তা এবং অনিশ্চয়তা হ্রাস করা। যদিও নতুন শ্রম আইন প্রবর্তনের ফলে প্ল্যাটফর্ম এবং গিগ কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষায় অন্তর্ভুক্তি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, তবে এর প্রধান চ্যালেঞ্জ হল আইনের প্রতিশ্রুতিগুলিকে বাস্তবে পরিণত করার উপযুক্ত ব্যবস্থা তৈরি করা। কেবল জিএসটি কমানোই যথেষ্ট নয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)