E-Paper

ভাঁড় ভবানী

প্রকৃতির উপহারকে নিত্যজীবনের সঙ্গে যুক্ত করা বরাবরই এ দেশের ঐতিহ্য। যেমন ভাঁড়ে চা-পান, শালপাতার থালা, কলাপাতায় ভোজ, মাটির হাঁড়ি-কলসি ব্যবহার, তালপাতার পাখার বাতাস ইত্যাদি।

শেষ আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ ০৬:২৬

কলকাতার বহু চায়ের দোকানেই মাটির ভাঁড়ের আকাল দেখা দিয়েছে, চা ঢালা হচ্ছে কাগজের কাপে। একে শুধু চা-প্রেমীদের তৃপ্তিতে ব্যাঘাত, অতএব তুচ্ছ সমস্যা হিসাবে গুরুত্বহীন ভাবলে চলবে না। প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে মাটি সংগ্রহ বন্ধ হওয়ায় ভাঁড়পট্টিগুলিতে কাঁচামাল, অর্থাৎ উপযুক্ত এঁটেল মাটির জোগান আটকে গিয়েছে। ফলে শিল্পীদের জীবিকা-সমস্যা দেখা দিয়েছে। আগেও প্রবল বৃষ্টি, বন্যার কারণে, রোদের অভাবে মাটি শুকানো যায়নি, ফলে মরসুমি ভাঁড়ের আকাল দেখা দিয়েছিল। ভারতীয় রেলও বহু বার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে মাটির ভাঁড়ে আস্থা রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু নিয়মিত জোগান সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ, মাটির ভাঁড়ের জোগান বরাবরই সমস্যাদীর্ণ, ফলত প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা জারি-মাত্র রাজ্যে শিল্পটি কার্যত থমকে গিয়েছে।

অথচ, প্রকৃতির উপহারকে নিত্যজীবনের সঙ্গে যুক্ত করা বরাবরই এ দেশের ঐতিহ্য। যেমন ভাঁড়ে চা-পান, শালপাতার থালা, কলাপাতায় ভোজ, মাটির হাঁড়ি-কলসি ব্যবহার, তালপাতার পাখার বাতাস ইত্যাদি। এগুলো পরিবেশবান্ধব, জৈববিয়োজ্য জীবনশৈলী হিসাবে সমাদৃত। কারণ, এগুলি ব্যবহার শেষে প্রকৃতিতে মিশে যায়, বর্জ্য কমায়। আজ সেই গৌরবের সংস্কৃতির সঙ্গেই ভারতীয়দের যোগাযোগ ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার ও সংরক্ষণে দীর্ঘ অবহেলা এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। যখন বাকি পৃথিবী, বিশেষত উন্নত দেশগুলি প্লাস্টিকমুক্ত ভবিষ্যতের কথা বলছে, তখন দেশের এই অপরিণামদর্শিতা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের, উদ্বেগের। উন্নত শহরগুলিতে বাঁশ, কাঠ বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য ধাতুকে পাত্র হিসাবে নির্বাচিত করা হচ্ছে। অথচ, ভারত মাটির ভাঁড়ের বদলে ক্রমশ কাগজের কাপে চা-পানে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। কারণ, ভাঁড়ের মতো এগুলি সরবরাহের সময় ভাঙার ভয় নেই, জোগান প্রচুর, ফলে সস্তা। কিন্তু গরম চা যাতে ঠিক ভাবে থাকে, তার জন্য এগুলিতে অনেক সময়ই প্লাস্টিকের আস্তরণ থাকে। যে কাপ পুরোপুরি প্লাস্টিকের, তার ক্ষতির পরিমাণ অবশ্যই আরও বেশি। গবেষণা জানিয়েছে, ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা নানা রাসায়নিক উপাদান উত্তাপের সংস্পর্শে পানীয়ে মিশে যেতে পারে। ফেলে দেওয়ার পরে এগুলি নর্দমায়, নদীতে, জমিতে জমে ও দূষণ বাড়ে। খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে আবার ফেরে মানবশরীরে।

জীবাণুমুক্ত রাখার সমস্যা, মাটিতে ধাতুর উপস্থিতি ইত্যাদি কিছু প্রশ্ন উঠলেও অধিকাংশ পরিবেশবিদই মাটির ভাঁড়ের পক্ষে। এটি ব্যবহারের পর মাটিতেই মিশে যায়, দূষণ বাড়ায় না। তা ছাড়া কুমোরদের জীবিকা সুরক্ষিত থাকে, পুষ্ট হয় গ্রামীণ অর্থনীতি। তবে, নদী, জলাভূমি বা কৃষিক্ষেত্রের ক্ষতি করে মাটি তোলাও সমর্থনযোগ্য নয়। ফলে মৃৎশিল্পের কাঁচামাল কোথা থেকে আসবে, সেই বিকল্প ব্যবস্থাটিরও বিষয়ে ভাবা জরুরি। যে ভাবে বাণিজ্যিক প্রয়োজন মেটাতে বালি, পাথর বা অন্যান্য খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে সমীক্ষা, চুক্তি ও নিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের নিয়ম করা হয়েছে সে ভাবেই ভাঁড়শিল্পের পুনরুজ্জীবনের স্বার্থে উপযুক্ত এঁটেল মাটির উৎস স্থির করতে হবে। কোথায় এই মাটি সংরক্ষিত হবে, কী ভাবে পরিবেশের ক্ষতি না করে সংগ্রহ করা যাবে, কী ভাবে মৃৎশিল্পীদের কাছে পৌঁছবে— এই সকল পরিকল্পনা নিয়ে স্পষ্ট প্রশাসনিক নীতির প্রয়োজন। নয়তো কুটিরশিল্প সমানেই অস্তিত্বসঙ্কটে পড়বে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Tea shop

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy