E-Paper

দুর্লক্ষণ

বাস্তবিক, চূড়ান্ত তালিকার পর যাঁদের নাম বাদ পড়ল, তাঁদের আবারও আবেদন করার সুযোগ মিলবে ভোটের পর, ফর্ম ৬-এর মাধ্যমে।

শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৯
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

এই রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের শুনানি পর্ব শেষ, এখন চূড়ান্ত তালিকার অপেক্ষা। আশ্চর্য যে, প্রথমে নথিভিত্তিক নাম তোলানো, তার পর প্রাথমিক খসড়া তৈরি, তার পর সংশয়ভিত্তিক নথি নিয়ে শুনানির এই দীর্ঘ পর্বসমূহ শেষ হওয়ার পরও শোনা গেল, কোন নথি জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে গ্রহণযোগ্য, আর কোনটি নয়, তা নিয়ে নতুন নির্দেশ এসেছে। প্রশ্ন হল— কার জন্য এই নির্দেশ? কমিশনের আধিকারিকদের জন্যই নিশ্চয়, যাঁরা চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করবেন? নিশ্চয় জনসাধারণের জন্য নয়, যাঁরা নাওয়াখাওয়া ভুলে নথি জমা করতে দীর্ঘ অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন? কেন নথি জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পর এমন কথা জানানো হচ্ছে— এর উত্তর স্বভাবতই পাওয়া যাবে না। কেননা, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘মন কি বাত’-এর মতোই নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন বিষয়টিও সম্পূর্ণ একপার্শ্বিক, এখানে দুই তরফের মধ্যে কোনও আদানপ্রদান নেই, সবটাই নির্দেশপালনের বাধ্যবাধকতা। এবং সেই নির্দেশ অস্পষ্ট ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। এই কারণেই হয়তো, এসআইআর সংক্রান্ত নির্দেশাবলি বহুলাংশে ওয়টস্যাপ-মাধ্যমে প্রদত্ত, যাতে স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা এবং অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য— কোনও বিষয়েই সামাজিক বা রাজনৈতিক স্তরে দায়বহনের ভার না-থাকে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী দেখা করেও সদুত্তর পাননি, যার ফলে শেষ অবধি তিনি সর্বোচ্চ আদালতে উপস্থিত হয়ে জনগণের তরফে ‘ওকালতি’ করেছেন। তাতে রাজনীতির এ-পারে ও-পারে কার কী লাভ হয়েছে তা অন্যত্র বিবেচ্য, কিন্তু এখনও পর্যন্ত ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ নামে যে দুর্বোধ্য ও দুর্ভেদ্য দেওয়াল নির্বাচন কমিশন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তোলা হয়েছে, তাকে ভেদ করার কোনও পথ বার করা যায়নি। কমিশনের স্বেচ্ছাচারী ভূমিকার কারণে যাঁদের নাম বাদ পড়বে, ভোটাধিকার থেকে তাঁরা বিনা প্রশ্নে বঞ্চিত হবেন, এ কথা এখন সংশয়াতীত।

বাস্তবিক, চূড়ান্ত তালিকার পর যাঁদের নাম বাদ পড়ল, তাঁদের আবারও আবেদন করার সুযোগ মিলবে ভোটের পর, ফর্ম ৬-এর মাধ্যমে। আবেদন জমা দিয়ে তার নিষ্পত্তির আর কোনও সুযোগ থাকবে না পশ্চিমবঙ্গের এ বারের বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার আগে। নির্বাচন কমিশনের কর্মপদ্ধতিতে নামতালিকা প্রকাশ ও ভোট নির্ঘণ্ট প্রকাশের মধ্যে কোনও সংশোধনের সময়সুযোগ নেই। কেন? এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, যার জরুরি উত্তরটিও মোটের উপরে জানা। একটি বিশেষ উদ্দেশ্যেই এই ঝাড়াই-বাছাই পর্ব নিয়ে এত তাড়াহুড়ো— এই অনুমান সম্ভবত নির্ভুল। নতুবা যে সরকার জনগণনা, জাতগণনার মতো কোনও জাতীয় কর্মসূচিতেই আগ্রহ দেখায় না, নির্বাচনমুখী রাজ্যে তাদের ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য এত অল্প সময়ে এতখানি কাজ শেষ করার এই মরিয়া ভাবের আর দ্বিতীয় কোনও ব্যাখ্যা হয় না।

গণতন্ত্রের নামে এই ভাবেই বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার একটি আদ্যন্ত অগণতান্ত্রিক কর্মসূচি চালিয়ে গেল— ইতিহাসে খোদিত থাকবে। মনে রাখা দরকার, যখন এসআইআর শুরু হয়েছিল, তখন কেন্দ্রীয় শাসক দল ছাড়াও অন্য কতিপয় বিরোধী দলের মুখে শোনা গিয়েছিল— এক জনও অবৈধ ভোটার যাতে না থাকে, তার ব্যবস্থা জরুরি। অবশ্যই যে কোনও সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে তেমনই হওয়া উচিত। তবে যে কোনও সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপে এক জনও বৈধ ভোটারকে বাদ দেওয়াও একই রকম অন্যায়, অসঙ্গত ও অগ্রহণযোগ্য। এই কথাটি এখন সজোরে বলা জরুরি, ভোটার তালিকা সংশোধন কোনও মতেই গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের কৌশল হতে পারে না। হিমালয়সমান দুর্ভাগ্য, ভারত দেশটি এত দ্রুত গণতন্ত্র-ব্যবস্থার নীচের দিকে তলিয়ে চলেছে যে এই জরুরি কাজটি ন্যায়সম্মত ভাবে পালিত হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal SIR Election Commission of India

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy