E-Paper

প্রতারণার জাল

প্রতারিতের তালিকায় অধ্যাপক থেকে সরকারি আধিকারিক, ছোটখাটো শিল্পপতি— সকলেই উপস্থিত। অর্থাৎ, শিক্ষিত সচেতন মানুষও জালিয়াতির হাত থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছেন না।

শেষ আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ ০৪:৫৭

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ভারতীয়রা সাইবার অপরাধের ফাঁদে পড়ে হারিয়েছেন ২২ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। ভারত যত ডিজিটাল হচ্ছে, যত বেশি মানুষ অনলাইন লেনদেনে অভ্যস্ত হচ্ছেন, সমাজমাধ্যম-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান করছেন, তত অর্থলোপাটের অঙ্কটি প্রতি বছর লাফিয়ে বাড়ছে। ২০২৪ সালের হিসাবটি আগের বছরের তুলনায় দু’শো শতাংশ বেশি। সুতরাং, বিপদ এখন ঘরের ভিতরে। দেড় বছর আগে কলকাতার নারকেলডাঙা থানা এলাকার বাসিন্দা এক মহিলা প্রতারিত হয়ে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তাঁর নামে আসা পার্সেলে মাদক মিলেছে এবং আধার কার্ড ব্যবহার করে বেআইনি লেনদেন হয়েছে— এমন সব ভুয়ো অভিযোগ জানিয়েছিল অপরাধী। অতঃপর গল্পটি চেনা। দু’দফায় প্রায় আশি লক্ষ টাকা খুইয়েছিলেন তিনি। অপরাধীরা কলকাতা পুলিশের জালে ধরা পড়েছে। উদাহরণ অজস্র। প্রতারিতের তালিকায় অধ্যাপক থেকে সরকারি আধিকারিক, ছোটখাটো শিল্পপতি— সকলেই উপস্থিত। অর্থাৎ, শিক্ষিত সচেতন মানুষও জালিয়াতির হাত থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছেন না।

উদ্বেগ এখানেই। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদী ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে ডিজিটাল অ্যারেস্ট বিষয়ে নাগরিককে সচেতন থাকার কথা বলেছিলেন। অতি সম্প্রতি ‘ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া’-র জারি করা সতর্কবার্তায় বেশ কিছু জরুরি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে— সিবিআই, পুলিশ পরিচয় দিয়ে ফোন করে কেউ আইন সংক্রান্ত জটিলতার কথা বললে ভয় না পেতে, কারণ বাস্তবে এ জাতীয় সমস্যা ফোনে জানানো হয় না; ভিডিয়ো বা অডিয়ো কলে গ্রেফতারের কথা বলে টাকা চাইলে বুঝতে হবে তা প্রতারণা, অবিলম্বে সরকার-নির্দিষ্ট ফোন নম্বর বা পোর্টালে অভিযোগ দায়ের করতে হবে। সামগ্রিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এ জাতীয় সতর্কবার্তা নিয়মিত প্রেরণ করা জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হল, প্রতারণার ফাঁদটি তো একটি নয়, অজস্র। সময়ের সঙ্গে প্রতারণার পদ্ধতিটিও দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ভুয়ো অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি রয়েছে সমাজমাধ্যমে বন্ধুত্বের বার্তা দিয়ে অর্থসাহায্যের নাম করে মোটা টাকা লুটও। সাবধান থাকার দায়িত্বটি গ্রাহকের উপর সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়ার অর্থ— প্রশাসনের নিজ দায়িত্ব এড়ানো।

বরং নাগরিকের তথ্য সংক্রান্ত যে সাবধানতা গ্রহণ সরকারের কাছে প্রত্যাশিত, সেই কাজটি কত দূর হয়েছে, প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। ভারতের এক বিরাট সংখ্যক নাগরিকের আধার তথ্য ফাঁস হওয়ার সংবাদটি বহু আলোচিত। এই বিপুল তথ্য প্রতারকদের হাতে পৌঁছনোর আশঙ্কাটি অমূলক নয়। প্রতিটি ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে আধার নম্বর যুক্ত করার যে সরকারি নিয়ম চালু হয়েছিল, তাতেও কি প্রতারণার পথটি আরও চওড়া হয়নি? পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে কাজে লাগিয়ে নতুন উপায়ে আর্থিক প্রতারণার খবর মিলেছে। নাগরিকত্ব প্রমাণের উৎকণ্ঠায় তথ্য জোগাড়ে ব্যস্ত মানুষ অনায়াসেই ফাঁদে পা দিচ্ছেন। অথচ, ভোটারের তথ্য সুরক্ষায় নির্বাচন কমিশন নিয়মমাফিক বিবৃতি দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছে। নতুন করে ‘নাগরিকত্ব’-এর প্রমাণ দাখিল করা যদি নাগরিকের দায়িত্ব হয়, তবে সরকারের দায়িত্ব তাঁদের তথ্য সুরক্ষিত রাখা, তাঁদের প্রতারণার ফাঁদ থেকে যথাসম্ভব রক্ষা করা। সেই কাজে ত্রুটি রাজধর্মের পরিচায়ক নয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Fraud Cyber Attack Fraud Case SIR

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy