E-Paper

বিবেচনার নামে

এই অব্যবস্থার সুযোগ দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন চালু হতে পারে না, কিংবা রাষ্ট্রপতি শাসনের অধীনে নির্বাচন ঘটতে পারে না।

শেষ আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:৩৯
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

ভোটার তালিকা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে যা চলছে, তা গণতন্ত্রের উপর এক ভয়ানক আঘাত। প্রথম থেকেই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের সময় নির্বাচন ও সময়সীমা নির্ধারণ নিয়ে যে সকল সংশয় দানা বেঁধেছিল, চূড়ান্ত তালিকা বেরিয়ে যাওয়ার পর এখন সেই সব সংশয় সম্পূর্ণ সত্য বলে প্রমাণিত। ষাট লক্ষের বেশি ভোটার ‘বিবেচনাধীন’। এই কথার অর্থ যদি হয় আসন্ন ভোট ঘোষণার আগেই তাঁদের ‘বিবেচনা’ করা হবে, তবে বলতেই হয়— এ এক অবাস্তব প্রত্যাশা। যা সময় বাকি আছে, তাতে এত পরিমাণ মানুষের ভোটাধিকার বিষয়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মীমাংসা হতে পারে না। সহজ অঙ্কের হিসাবে, এখনও অবধি যত বিচারক এই রাজ্য ও ভিন রাজ্য থেকে এ কাজের জন্য নিয়োজিত হয়েছেন, তাঁদের এই কাজ সারতে মানুষ-প্রতি মিনিট দুই-আড়াই সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। মানুষের জীবন নিয়ে এই ছেলেখেলাই কি ভারতীয় গণতন্ত্রের নিয়তি? নাগরিক সমাজের দিক থেকে এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দাবি করা উচিত, কেন এই পরিস্থিতিতে ফেলা হল অগণন মানুষকে? দ্বিতীয়ত, যদি ‘বিবেচনা’ শেষ না হয়, তা হলে কি এত লক্ষ মানুষকে বাদ দিয়েই ভোটপর্ব সমাধা হবে? কেবল নামপদবি বানানের বেমিল-হেতু? এটাই কি গণতন্ত্রমতে সিদ্ধ? রাজনৈতিক দলগুলি এসআইআর চলাকালীন বলেছিল, এক জন বৈধ ভোটারকেও বাদ দেওয়া চলবে না। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিআইএম, কংগ্রেস, সকলেই এই মুহূর্তে নতুন করে চাপ দিতে শুরু করেছে কমিশনের উপর। বিজেপি স্বভাবতই নীরব। তবে স্পষ্ট করে বলা দরকার, রাজনৈতিক তরজা সত্ত্বেও মানুষের ভোটাধিকার কেবলমাত্র রাজনৈতিক বিষয় নয়। গণতন্ত্রের দেশে এ হল মানুষের প্রধান অধিকারগুলির মধ্যে অন্যতম। অসমে যেমন ঘটেছে, এ রাজ্যেও প্রশাসনের খেয়ালখুশিতে সেই ভোটাধিকার গায়েব হয়ে যেতে পারে না। সুতরাং নাগরিক সমাজেরও দাবি— বিবেচনাধীন ভোটারদের বিবেচনা শেষ না করে ভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে না।

দ্বিতীয় আর একটি দাবি আছে, দ্ব্যর্থহীন। এই অব্যবস্থার সুযোগ দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন চালু হতে পারে না, কিংবা রাষ্ট্রপতি শাসনের অধীনে নির্বাচন ঘটতে পারে না। সেটা হবে চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক। কাশ্মীর বা মণিপুরের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তফাত বিস্তর, ব্যাপক, গভীর। এশিয়ার পাকিস্তান, মায়ানমার, কিংবা পশ্চিম এশিয়ার দেশ, কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার দেশের সঙ্গেও ভারতের দূরত্ব শত আলোকবর্ষ-সমান। উল্লেখ্য, এমনকি যে দেশের উপর সাম্প্রতিক কালে শতনিন্দাবর্ষণ হয়ে থাকে, সেই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশেও কিন্তু গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে এমন ছেলেখেলায় রূপান্তরিত করা হয়নি।

কয়েকটি প্রশ্ন অত্যন্ত জরুরি। এক, যে রাজ্যে ভোটের ম্যাপিং-চিত্র যথেষ্ট ভাল ছিল, সেখানে অকস্মাৎ ষাট লক্ষ বিবেচনাধীন ভোটার এল কী করে। দুই, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ এবং ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ শব্দবন্ধ যখন কস্মিন্‌কালেও ভোটার তালিকা প্রসঙ্গে ব্যবহার হয়নি, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেই দু’টিকে আবিষ্কার করা ও প্রথম বার প্রয়োগ করার কারণ কী। তিন, বিচারকদের উপর যদি ভার থাকে ‘বিচার’ করার, সেখানে ‘বিচারাধীন’-এর কথা শোনার ব্যবস্থা নেই কেন। চার, ম্যাপিং-এ যে অঞ্চলে হিসাবে গরমিল, বিবেচনাধীন তালিকায় দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য অঞ্চল থেকে লাখে লাখে নাম উঠে এসেছে— কেন? পাঁচ, তথ্য প্রকাশে নির্বাচন কমিশন ও তার নিযুক্ত অবজ়ার্ভার-প্রমুখের এত অনিচ্ছা ও অস্বচ্ছতা কেন? ভোটার তালিকা সংশোধন কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে চালিত গোপন গোয়েন্দা কার্যক্রম নয়, একটি রুটিন প্রশাসনিক কার্যক্রম— অন্তত ২০২৫-২৬ সালের আগে সেটাই ছিল রীতি। তা হলে তথ্যসংক্রান্ত স্বচ্ছতার এত অভাব কেন? নাগরিক সমাজ এর প্রতিটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দাবি করছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Voter Election Commission of India

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy