সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন ফিজ়িয়োথেরাপি। নিয়মিত ক্লাস করা হত না অভিশী বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ই স্ট্রোকে শরীরের ডান দিক অসাড় হয়ে যায় তার। নতুন করে লেখা শিখতে হয় তাকে, বাঁ-হাতে। এক সময় প্রায় ছ’মাস শয্যাশায়ী হয়ে থাকা অভিশী সিবিএসই দশম শ্রেণির বোর্ডের পরীক্ষায় পেয়েছে ৮৬.২ শতাংশ নম্বর। মাত্র একুশ দিন বয়সে মেসোকার্ডিয়া ধরা পড়ার পর ওম ঘোষকে দু’টি ওপেন হার্ট সার্জারির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একটি দেড় বছর বয়সে, অন্যটি সাতে। ওমের লড়াই প্রায় প্রতি দিনের। অধিক পরিশ্রম তার ক্ষেত্রে বিপদস্বরূপ, কড়াকড়ি খাবারের ক্ষেত্রেও। ওম সিবিএসই-তে পেয়েছে ৮৫.৬ শতাংশ নম্বর। বিরল জিনঘটিত রোগ ‘স্পাইনাল মাস্কুলার অ্যাট্রফি’ আক্রান্ত দেবস্মিতা ঘোষ পেয়েছে ৯৮.৬ শতাংশ নম্বর। যে মেয়েকে ঘুমোনোর সময় পাশ ফিরতে, পেনের ঢাকনা, জলের বোতল খুলতেও অন্যদের সাহায্য নিতে হয়, সে-ই অঙ্কে ১০০, ইংরেজিতে ৯৯, বাংলায় ৯৬, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ১০০ নম্বর পেয়েছে। যারা মনে করে, এমন রোগে জীবন থমকে যায়, দেবস্মিতার প্রাপ্তি সেই ধারণার মুখে সপাট উত্তর।
বোর্ডের মেধা-তালিকায় প্রতি বছরই এমন ছাত্রছাত্রীরা কিছু বাড়তি আলো যোগ করে। আলো, এক অসম লড়াই জিতে যাওয়ার। তাদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রস্তুতি, মেধা ফলাফল গড়ে দেয় না। যোগ হয় প্রতি দিনের ভাল থাকার তাগিদও। এবং সেই প্রচেষ্টায় হামেশাই অন্যরা পাশ থেকে সরে যায়, মুখ ফেরায়। তাই তাদের কৃতিত্ব শুধুমাত্র কিছু নম্বর প্রাপ্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ ভাবেও যে ভাল থাকা যায়, স্বপ্নপূরণ করা যায়— সেই বোধ অন্যদের মধ্যেও জাগিয়ে তোলাই তাদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। স্কুল, তাদের এই চলার পথে পাশে দাঁড়িয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে নয়। বিরল রোগ, বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে অনেক স্কুলই মুখ ফিরিয়েছে। বিশেষ ভাবে সক্ষমদের জন্য পৃথক পরিকাঠামোযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বা আছে কতটুকু? অ-সুস্থ সন্তানকে নিয়ে একের পর এক স্কুলের দরজা থেকে ফিরে আসা— অভিভাবকদের লড়াইও কম নয়। কিন্তু অ-প্রাপ্তির শূন্যস্থানটুকু পূর্ণ করেছে সেই বিশেষ ছাত্রছাত্রীদের জেদ, সাফল্যের খিদে। তারা জয়ী।
প্রসঙ্গত, জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০ ‘সমান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা’র বিষয়টি তুলে ধরেছিল, যার মূল উদ্দেশ্য সমস্ত শিশু, বিশেষত আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া এবং বিশেষ ভাবে সক্ষমরা যাতে মূল ধারার শিক্ষার সমান সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করা। কিন্তু নীতি প্রণয়ন আর বাস্তব রূপায়ণের ফারাকটি এ দেশে, রাজ্যেও অসেতুসম্ভব। বিগত কয়েক বছরে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই যেমন অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকাঠামোগত পরিবর্তন করেছে, শিক্ষক নিয়োগ করেছে, তেমনই সেই পরিকাঠামোর অভাবই বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে, বিশেষত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, অ-সুস্থ বা বিশেষ ভাবে সক্ষম ছাত্রছাত্রীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে দিয়েছে। আগামী দিনে সেই ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বিশেষ নেই। যেখানে সাধারণ সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার উপক্রম, সেখানে সরকার প্রতিবন্ধকতাযুক্তদের ভবিষ্যৎ বিষয়ে উদ্যোগী হবে, এমন ভাবনাও অবাস্তব। তাই বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলে আলো কিছু কম পড়বে— আরও অনেক দিন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)