E-Paper

ত্রিফলা সঙ্কট

অপারেশন সিন্দুরের পরে ইসলামাবাদের প্রতি আঙ্কারার খোলা সমর্থন, ভূরাজনীতিতে পাকিস্তানের অবস্থান আরও পোক্ত করেছে। সেই কারণেই সম্ভাব্য ‘ইসলামিক নেটো’-কে নিছক কথার কথা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া উচিত হবে না ভারতের।

শেষ আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫২

নতুন বছরেও ভূরাজনীতিতে উদ্বেগ যেন পিছু ছাড়ছে না ভারতের। জানা গেছে, গত বছর পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে নেটো-সদৃশ প্রতিরক্ষা জোটে এ বার যোগ দিতে আগ্রহী তুরস্ক। তেমনটা হলে এই জোট দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে নীরবে কিন্তু মৌলিক ভাবে নতুন রূপ দিতে পারে। লক্ষণীয়, তুরস্ক কেবল আর একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, আমেরিকা নেতৃত্বাধীন নেটো জোটের দীর্ঘ দিনের সদস্যও বটে। আমেরিকার পরে নেটো-য় দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী তাদেরই। এমতাবস্থায়, ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝে সমান্তরাল প্রতিরক্ষা কাঠামো অন্বেষণে আঙ্কারার এ-হেন সিদ্ধান্ত তার কৌশলগত অবস্থানে একটি সুচিন্তিত পুনর্বিন্যাসেরই ইঙ্গিতবাহী।

অন্য দিকে, ইসলামাবাদের ক্ষেত্রে এটি নিজেকে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর ইসলামিক রাষ্ট্র এবং মুসলিম স্বার্থের স্বঘোষিত রক্ষক হিসেবে তুলে ধরার একটি সুযোগও বটে। এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার হয়েছে সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পর থেকে, যেখানে বলা হয়েছে ‘এক জনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে উভয়ের বিরুদ্ধেই আগ্রাসন’ হিসেবে গণ্য করা হবে। শব্দচয়নটি নেটো-র ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে বিশেষ সাদৃশ্যপূর্ণ। দেশে অর্থনৈতিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াইয়ের মাঝে এখন মুসলিম বিশ্বে এই যুক্তিটিই প্রসারিত করতে চাইছে পাকিস্তান। এ দিকে, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইসলামি বিশ্বে আর্থিক শক্তির পাশাপাশি আঞ্চলিক ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব রয়েছে সৌদি আরবের। বিদ্যমান চুক্তির শর্তানুযায়ী পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে, যা আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বহন করে। অন্য দিকে, এই চুক্তির প্রতি তুরস্কের আগ্রহ আঙ্কারা ও রিয়াধের মধ্যে সুসম্পর্কের কারণে, যা এত কাল ঐতিহাসিক ভাবে সুন্নি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দ্বারা চিহ্নিত হয়ে এসেছে। উভয় রাষ্ট্রই এখন পূর্ববর্তী উত্তেজনা কাটিয়ে উঠেছে এবং ইরান, সিরিয়া ও বৃহত্তর আঞ্চলিক শৃঙ্খলা নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগের কারণে একত্রিত হয়ে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রসারিত করছে।

ভারতের ক্ষেত্রে এ-হেন জোটের ন্যূনতম সম্ভাবনা একটি নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জও বটে, যা সবচেয়ে সংবেদনশীল সমস্যাগুলি— কাশ্মীর, আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং ভূমধ্যসাগর থেকে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। বিশেষত, পাকিস্তানের কারণে। এটি বরাবর তার ইসলামিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে অর্গানাইজ়েশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি)-এর মতো মঞ্চে কাশ্মীরের বিষয়টিকে ধারাবাহিক ভাবে আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা করেছে। সে ক্ষেত্রে এমন একটি সামরিক চুক্তি ইসলামাবাদকে ভারতবিরোধী কার্যকলাপে আরও উৎসাহিত করবে, যা এখন সম্মিলিত নিরাপত্তার আড়ালে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। অপারেশন সিন্দুরের পরে ইসলামাবাদের প্রতি আঙ্কারার খোলা সমর্থন, ভূরাজনীতিতে পাকিস্তানের অবস্থান আরও পোক্ত করেছে। সেই কারণেই সম্ভাব্য ‘ইসলামিক নেটো’-কে নিছক কথার কথা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া উচিত হবে না ভারতের।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

NATO Diplomacy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy