E-Paper

দেশের বয়স

ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। তা বলে ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’-এর যে আশঙ্কা নিয়ে বিচলিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, এ কথা বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলে আসছেন।

শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৬
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

ভারতের নাগরিকদের এক বৃহৎ অংশ তরুণ। জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি হল ১৫-৫৯ বছর বয়সি মানুষ। যার অর্থ, রোজগেরে মানুষদের সংখ্যা বেশি, তাঁদের উপরে নির্ভরশীল মানুষের (শিশু ও বৃদ্ধ) সংখ্যা কম। জনসংখ্যার গঠন এমন থাকলে সে দেশ তারুণ্যের আধিক্যের জন্য বিশেষ লাভ পায়, পরিভাষায় যাকে বলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ বেশি হয়, আর্থিক বৃদ্ধিতে গতি আসে। বেশির ভাগ উন্নত দেশে যেখানে বৃদ্ধদের সংখ্যা বাড়ছে, তরুণ-যুবকদের অনুপাত কমছে, সেখানে ভারতের তারুণ্যের আধিক্য-জনিত সুবিধা তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু খুব বেশি দিন এই সুবিধা পাওয়া যাবে না। একটি ভারতীয় ও একটি আন্তর্জাতিক অসরকারি সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনআনর‌্যাভেলিং ইন্ডিয়াজ় ডেমোগ্রাফিক ফিউচার-এ বলা হয়েছে যে, আর মাত্র পাঁচ বছর পরে ভারতের কর্মক্ষম মানুষদের সংখ্যা শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করবে। ২০৩১ সালে ১৫-৫৯ বছর বয়সিরা হবেন জনসংখ্যার ৬৫.৮%। তার পর তাঁদের অনুপাত কমবে, বাড়বে বৃদ্ধদের অনুপাত। ২০৫১ সালে ভারতে পাঁচ জনে এক জন হবেন বৃদ্ধ, যা বর্তমান অনুপাতের (জনসংখ্যার ৯.৬%) দ্বিগুণ। আশি-ঊর্ধ্ব জনসংখ্যা বাড়বে আরও দ্রুত হারে। এই পরিস্থিতিতে যা জরুরি, তা হল ১৫-৫৯ বছরের মানুষদের উৎপাদনশীলতা যথাসম্ভব বাড়িয়ে তোলা, যাতে জনসংখ্যার কাঠামোয় পরিবর্তনের আগেই রাষ্ট্র যথেষ্ট সম্পদশালী হয়ে উঠতে পারে। আগামী দু’তিন দশক যদি ভারতের যুবপ্রজন্ম কর্মহীনতা, স্বল্প রোজগারের জাঁতায় আটকে থাকে, তা যেমন হবে ভারতের মানবসম্পদের অপচয়, তেমনই তার প্রভাব পড়বে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হারে।

ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। তা বলে ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’-এর যে আশঙ্কা নিয়ে বিচলিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, এ কথা বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলে আসছেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটিও তা মনে করাচ্ছে। ভারতের জনসংখ্যা বাড়ছে বছরে গড়ে ০.৯% হারে। হারটি প্রত্যাশার চেয়ে কম। বিভিন্ন রাজ্যে এই হারের অবশ্যই হেরফের রয়েছে। বিহারে শিশুরা (০-১৪ বছর) জনসংখ্যার ৩০%, যা ভারতে সর্বোচ্চ; কেরলে সর্বনিম্ন— ১২%। আবার, বৃদ্ধরা (৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব) কেরলের জনসংখ্যার ১৬%, যা ভারতে সর্বাধিক; উত্তরপ্রদেশে তাঁদের অনুপাত সর্বনিম্ন— আট শতাংশ। এই ভিন্নতা ভিন্ন ধরনের নীতিও দাবি করে। তবে প্রায় সব রাজ্যে জন্মহার নিম্নমুখী। এ প্রসঙ্গে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হল, বিবিধ সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচকে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলির জনসংখ্যায় যে হেতু তরুণদের অনুপাত দ্রুততর হারে কমছে, ফলে গোটা দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতায় তার প্রভাব হবে জনসংখ্যায় তারুণ্য হ্রাসের সর্বভারতীয় গড়ের প্রত্যাশিত প্রভাবের চেয়ে বেশি।

এর মোকাবিলা করতে অবিলম্বে কিছু নীতিকে কার্যকর করা প্রয়োজন। তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি, তার জন্য কাজের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে দ্রুত পৌঁছতে হবে। যে হেতু জনসংখ্যার গঠনে হেরফেরের জন্য কিছু রাজ্যে শ্রমিকের চাহিদা বাড়বে, আর কিছু রাজ্যে থাকবে উদ্বৃত্ত শ্রমিক, তাই শ্রমিক-কর্মীদের সুষ্ঠু পরিযাণ নীতি রূপায়ণ করা দরকার। সেই সঙ্গে, আরও মহিলা শ্রমবাহিনীতে আনার জন্য শিশু-বৃদ্ধদের দেখাশোনা, নিরাপদ পরিবহণ প্রভৃতির ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করতে হবে রাষ্ট্রকে। সরকারি তথ্য অনুসারে, প্রাক্-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে নথিভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা ছ’বছরে (২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫) কমেছে ১.৩৪ কোটি। প্রবণতাটি ভয়ঙ্কর— শিশুদের শিক্ষা ও সুরক্ষায় অধিক বিনিয়োগ আবশ্যিক। অন্য দিকে, সক্ষম এবং আগ্রহী প্রবীণদের কর্মনিযুক্তির সুযোগ তৈরি করা দরকার। পাশাপাশি, বৃদ্ধাবাস, ‘হসপিস’ প্রভৃতি তৈরিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। জনসংখ্যায় পরিবর্তনের নকশা মাথায় না-রাখলে উন্নত দেশে উত্তরণের লক্ষ্য অধরাই থাকবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

youths

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy