E-Paper

সাদাকালোর বাইরে

ইউক্রেন ও প্যালেস্টাইন নিয়েও ভারতকে কূটপারাবারে ভাসতে হয়েছে, এ বার ইরান। আশা করা যায়, কূটনীতির পা তোলা পা ফেলায় দিল্লি এখন যথেষ্ট সতর্ক।

শেষ আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৯

কাব্যসাহিত্যে এ কুল ও কুল দু’কুল যাওয়ার কথা শোনা যায়, কিন্তু দুই কুল রাখার উপায় সহজশ্রাব্য নয়। কূটনীতি সাহিত্য নয়, ফলে ভারত সরকারের লক্ষ্য আপাতত, কোনও না কোনও উপায়ে দুই নৌকায় একই সঙ্গে পা রেখে শক্ত ভাবে দাঁড়ানো। ইরানের রক্ষণশীল মৌলবাদী খামেনেই-তন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ-আন্দোলনে সে দেশের জনসমাজের একাংশ, বিশেষত নারীরা, যে ভাবে ফুঁসে উঠেছেন, গত কয়েক দশকের মধ্যে তা অদৃষ্টপূর্ব। উনিশশো সত্তরের দশকে ইরানি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রেজ়া শাহ পাহলভি-র শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই মৌলবাদী শক্তি ক্ষমতারোহণ করেছিল। তার পর থেকেই এই শাসক-গোষ্ঠী ইরানি সমাজে ও অর্থনীতিতে শ্বাসরোধকারী পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে, গণতান্ত্রিক অধিকার ও নারীস্বাধীনতার পথে শৃঙ্খলের প্রাচীর তৈরি করেছে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, আজকের এই ঐতিহাসিক সামাজিক মন্থনের সময়ে ভারতের মতো দেশের— যা অন্তত নামপরিচয়ে আজও গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ— কিছু নৈতিক দায়িত্ব আছে কি না। উপরন্তু, যখন আমেরিকা ও ইউরোপের প্রধান দেশগুলি সক্রিয় সমর্থন জানিয়েছে ‌ইরানি বিদ্রোহীদের, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সহায়তা প্রেরণের আশ্বাস দিয়েছেন— এমন সময়ে ইরানের রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে থাকাটা কেন ভারতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, সহজেই বোঝা সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে ভারত এখনও আমেরিকার মৈত্রী-প্রার্থী, ট্রাম্পের শুল্কনীতির শেল ভারতস্বার্থকে যতই বিঁধুক না কেন।

বিপরীতে, ভারত-ইরান সমীকরণের একটি বিরাট গুরুত্ব আছে, দুই দেশের কাছেই। ইরানি বিপ্লবের পর থেকেই তেহরান-দিল্লির সম্পর্কের ভিত্তিটি আদর্শভিত্তিক ছিল না। গণতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতার সূত্র দিয়ে তা রচনা করতে গেলে গত কয়েক দশকেও এই সম্পর্কে চাপ পড়তে পারত। বাস্তবে তা হয়নি, উভয় দেশই ভূরাজনীতিক লক্ষ্যগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিজেদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দৃঢ়বন্ধনে রাখতে পেরেছে, পারস্পরিক সহায়তার মডেল তৈরি করতে পেরেছে। এই মুহূর্তে সেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্ব ভারতের কাছে আরও বেশি, কেননা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লি এখন কূটনৈতিক ভাবে অত্যন্ত একাকী, প্রায় সমস্ত প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রতি বিদ্বিষ্ট, এবং স্থানীয় মহাশক্তি চিন ভারতের অমিত্রসুলভ প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিত্রতাবন্ধন তৈরিতে বিশেষ মনোযোগী। দিল্লি-তেহরান সম্পর্কের অসীম গুরুত্ব বোঝা যায় পাকিস্তানের কথা কিংবা পাকিস্তানের মাধ্যমে চিনা প্রতিপত্তির কথা মাথায় রাখলে। মধ্য এশিয়ায় পাকিস্তানের প্রভাব কমিয়ে রাখতে বিশেষ সক্রিয় তেহরান। তা ছাড়া, সাম্প্রতিক চিনা উদ্যোগে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে মধ্য-পশ্চিম এশিয়ার যে স্থলবাণিজ্যপথ তৈরি হচ্ছে, তা কিন্তু ভারতের জন্য রুদ্ধ করে দিতে পারে বহু বাণিজ্য সম্ভাবনা। ইরান-ভারত মৈত্রী-সূত্রে নির্মীয়মাণ চাবাহার বন্দরের গুরুত্ব সে ক্ষেত্রে অপরিমেয়। সব মিলিয়ে ভারত এখন যে পরিস্থিতিতে, তাতে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ-বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে দিল্লির পক্ষে আদর্শনৈতিক অবস্থান নেওয়া কঠিন। তেহরানের শাসনকেন্দ্রের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্ব কিংবা শত্রুতা তৈরি করার মতো ঝুঁকি ভারত নিতে পারে না।

কূটনীতির ক্যানভাস সাদাকালোয় রচিত হয় না, তার মধ্যে রঙের নানা পর্যায়বিন্যাস। দিল্লির সামনে এখন গুরুদায়িত্ব, সযত্নে সেই ধূসর ক্যানভাসের কূটনীতি রচনা, গণতান্ত্রিক অধিকার-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়েও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল আবর্তে সাক্ষাৎ ভাবে জড়িয়ে না পড়া। ইরান বাংলাদেশ নয়, সেখানে ভারতের ভূমিকা কিছুটা দূরত্বের সুরে বাঁধা যেতেই পারে। ইতিপূর্বে ইউক্রেন ও প্যালেস্টাইন নিয়েও ভারতকে কূটপারাবারে ভাসতে হয়েছে, এ বার ইরান। আশা করা যায়, কূটনীতির পা তোলা পা ফেলায় দিল্লি এখন যথেষ্ট সতর্ক।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Iran Diplomacy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy