E-Paper

দেশ-দ্রোহ

ঘৃণ্য রাজনীতির দ্রুত প্রসার সত্ত্বেও ভারতের সংবিধান এখনও ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ পরিসর হিসাবেই চিহ্নিত করে রেখেছে, হিন্দুরাষ্ট্র হিসাবে নয়।

শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ০৫:২৩

তিনি যে হিমন্তবিশ্ব শর্মার চেয়ে পিছিয়ে থাকতে চান না, আরও এক বার তার প্রমাণ দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। দোল উপলক্ষে এক জনসভায় গিয়ে তিনি স্লোগান দিলেন, ভারতের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা নিপাত যাক’। দেশের নাম যখন হিন্দুস্থান, তখন হিন্দুরাই সে দেশে রাজত্ব করবেন, এবং হিন্দু-বিরোধীদের ধ্বংস হতে হবে— বিরোধী দলনেতার যুক্তিক্রমটি স্পষ্ট। হিমন্ত যেমন সে রাজ্যের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ‘ভাতে মারা’-র বিধান দিয়েছেন, শুভেন্দুবাবু এ দফায় তত দূর যাননি। তবে, যাবেন না, এমন কোনও ভরসা তাঁর আচরণে নেই। থাকার কথাও নয়। কারণ, তিনি যে অবস্থানটি প্রচার করছেন, তাতে ব্যক্তি হিসাবে তিনি কত দূর বিশ্বাসী, সে প্রশ্ন অবান্তর— অবস্থানটি স্পষ্টতই তাঁর দলের। নচেৎ, একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং অপর রাজ্যের বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা— যে পদের গুরুত্ব মুখ্যমন্ত্রী পদের অপেক্ষা খুব কম নয়— প্রায় একই ভাষায় একই রকম বিদ্বেষ ভাষণ করতেন না। হিমন্তের ক্ষেত্রে দল এই ঘৃণা-ভাষণে তিলমাত্র আপত্তি প্রকাশ করেনি; শুভেন্দুর ক্ষেত্রেও করবে না বলেই অনুমান করা চলে। অর্থাৎ, এই বিদ্বেষ-বার্তায় দলের সমর্থন রয়েছে। হিমন্ত-শুভেন্দুরা হিন্দুরাষ্ট্রের যে বিদ্বিষ্ট-খোয়াব ফিরি করছেন, সেটি তাঁদের কল্পনাসঞ্জাত নয়, ভারতের গৈরিক বাস্তুতন্ত্র অন্তত একশো বছর ধরে সে কথা বলছে। ফারাক হল, কিছু বছর আগেও প্রকাশ্যে এমন ঘৃণা-ভাষণের কথা ভাবতে পারতেন না কোনও কট্টরতম হিন্দু; আর এখন, এই নরেন্দ্র মোদীর অমৃতকালে, ঘৃণা এমনই ‘স্বাভাবিক’ হয়েছে যে, হিমন্ত-শুভেন্দুদের মতো নেতারা এমন বিষোদ্গিরণের আগে দ্বিতীয় বার ভাবেন না। তাঁরা জানেন, বিষের বেসাতিই এখন রাজনীতির পরম ধর্ম।

এই ঘৃণ্য রাজনীতির দ্রুত প্রসার সত্ত্বেও ভারতের সংবিধান এখনও ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ পরিসর হিসাবেই চিহ্নিত করে রেখেছে, হিন্দুরাষ্ট্র হিসাবে নয়। প্রশ্ন হল, সেই পরিসরে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার নিপাত কামনা করা কি রাষ্ট্রদ্রোহ নয়? তা না হলে রাষ্ট্রদ্রোহের সংজ্ঞাটিকেই নতুন ভাবে স্থির করতে হবে। কোনও ধর্মের প্রতি সরাসরি বিদ্বেষজ্ঞাপন ভারতীয় সংবিধানের বিরোধী, কয়েক দিন আগেই সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য বিচারপতি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তা আবার নতুন করে বলেছেন। অবশ্য বিজেপি নেতারা জানেন, রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের নিগড় তাঁদের জন্য নয়, সংবিধানবিরোধিতার অপরাধও তাঁদের বর্তায় না। বর্তমান মোদী-ভারতের সমস্ত কঠোরতাই বরাদ্দ— রাজনৈতিক বিরোধীদের জন্য। তাঁরা এ কথাও জানেন যে, সংবিধানের নামে শপথ গ্রহণ করে তাঁরা যে ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন, সেই ক্ষমতাকেই সংবিধানের ধ্বংসসাধনের কাজে ব্যবহার করতে তাঁরা বিলক্ষণ অধিকারী। হিন্দুত্বের রাজনীতি ভারতে আজ একশৈলিক ক্ষমতার অধিকারী, যে গেরুয়া রঙের শিলার আড়ালে যাবতীয় অন্যায় অনায়াসে চাপা পড়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে, নাগরিক সমাজের কর্তব্যটি গুরুতর। ভারত নামক ধারণাটিকে তাঁদেরই প্রাণপণে রক্ষা করতে হবে। যাঁরা সর্বধর্মসমন্বয় বা ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণায় বিশ্বাসী, এ তাঁদের কর্তব্য। যাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের আধিপত্যে বিশ্বাসী, তাঁদেরও কর্তব্য। কেননা তাঁদেরও মনে রাখতে হবে, বিদ্বেষ ও বিভাজনের বিষ কিন্তু সর্ব ক্ষণ ‘অপর’ খুঁজে বেড়ায়, শত্রু না থাকলে বিদ্বেষেরও অস্তিত্ব থাকে না। এক বার শত্রু হিসাবে সংখ্যালঘুর প্রয়োজন ফুরোলে তার পর বিদ্বেষের অন্য লক্ষ্যবস্তু স্থির হয়। সেই লক্ষ্য হয়তো হবে খাদ্য, পরিধেয়, ভাষা, সংস্কৃতি। তখন আজকের এই উৎসাহী সমর্থকরাই বিপন্ন হয়ে পড়বেন। আসলে সর্বজনীনতার ধারণাটি একটি রক্ষাকবচ— আজ তাকে রক্ষা না করলে কাল নিজের প্রয়োজনে আর সেই রক্ষাকবচের আশ্রয় পাওয়া যায় না। বিদ্বেষের রাজনীতি শেষ অবধি কাউকে ছাড়ে না, এ কথাটি বুঝে নেওয়া ভাল। অনেক হয়েছে, আর নয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Constitution Harmony

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy