E-Paper

আত্মসমর্পণ

নতিস্বীকারের একমাত্র নিদর্শন রাশিয়া থেকে তেল কেনার পরিমাণ হ্রাসের সিদ্ধান্তই নয়।

শেষ আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৯
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ভারতের উপরে যে চড়া শাস্তিমূলক শুল্ক চাপিয়েছিল আমেরিকা, তা অনেকখানি কমাতে সম্মত হল— আপাতদৃষ্টিতে তাকে ভারতের পক্ষে ইতিবাচক সংবাদ বলে ভ্রম হতে পারে। অনেকে অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, প্রাক্-ট্রাম্প পর্যায়ে আমেরিকায় ভারতীয় পণ্যের উপরে গড় আমদানি শুল্কের হার ছিল অত্যন্ত কম; আজকের ‘কমিয়ে আনা’ ১৮ শতাংশের চেয়ে ঢের কম। কিন্তু, সে তর্কে ঢোকা অর্থহীন— ট্রাম্প-পূর্ব আমেরিকা নেহাতই অতীত; তার সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ অতি ক্ষীণ। প্রশ্ন হল, ৫০% থেকে শুল্কের হার ১৮ শতাংশে কমিয়ে আনার ‘সাফল্য’ ভারত অর্জন করল কী ভাবে? লক্ষণীয়, ইদানীং ভারত সংক্রান্ত খবর ভারতবাসী ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল থেকেই পেয়ে থাকেন— বর্তমান ঘটনাক্রমও তার ব্যতিক্রম নয়। সেখানে ঘোষণার পর এক সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরেও ভারত সরকার এই চুক্তি বিষয়ে কোনও পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি দেয়নি, সংসদ চলা সত্ত্বেও সেখানে আলোচনা করেনি। বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল জানিয়েছেন, দেশের মানুষের জ্বালানি-নিরাপত্তার গুরুত্ব সর্বোচ্চ— ফলে, শুধু রাশিয়ার উপরে নির্ভরশীল না-হয়ে পেট্রলিয়াম আমদানির ক্ষেত্রে ‘ডাইভার্সিফাই’ করাই উচিত নীতি। মন্ত্রীর এই অবস্থানটি ঠিক না ভুল, তার চেয়ে অনেক বড় প্রশ্ন হল, আমেরিকা হাত মুচড়ে ধরার পরই এই ঔচিত্যবোধটি জাগ্রত হল কেন? বাণিজ্যিক কূটনীতির মঞ্চে এমন বিপুল দুর্বলতা ভারত এর আগে কখনও প্রকাশ করেছে কি না, তাতে সংশয় আছে। এর মাধ্যমে ভারত যে বার্তাটি দিল, তা ভয়ঙ্কর— ঠিক জায়গায় চেপে ধরলে ভারতকে নতিস্বীকার করানো কোনও ব্যাপারই নয়। বার্তাটি কিন্তু শুধু আমেরিকা নয়, গোটা দুনিয়াই খেয়াল করেছে।

নতিস্বীকারের একমাত্র নিদর্শন রাশিয়া থেকে তেল কেনার পরিমাণ হ্রাসের সিদ্ধান্তই নয়। ভারতের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল, আমেরিকা ভারতের যত পণ্য আমদানি করে, ভারতের বাজারে তত পণ্য রফতানি করতে পারে না। এই অভিযোগের সত্যতা মাপা যায় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত/ঘাটতির মাপকাঠিতে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের হিসাব অনুসারে, ২০২৫-এর এপ্রিলে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত ছিল ৩১৭ কোটি ডলার— নভেম্বরে এসে তা কমে দাঁড়ায় ১৭৩ কোটি ডলারে। এই সময়কালে, বিশেষত অগস্টের শেষে ভারতীয় আমদানির উপরে শাস্তিমূলক ৫০% শুল্ক আরোপের পর, ভারতের বাজারে আমেরিকার পণ্য আমদানির পরিমাণ বেড়েছে বিপুল হারে; আর, সে হারে না হলেও আমেরিকায় ভারতীয় রফতানি হ্রাস পেয়েছে। এবং, আমেরিকায় ভারতীয় রফতানি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বস্ত্র, চর্মজাত দ্রব্য বা ক্রীড়া উপকরণের মতো শ্রমনিবিড় ক্ষেত্রে। সহজ কথা, ভারতের কব্জি মুচড়ে আমেরিকা নিজের চাহিদা পূরণ করেছে।

পাশাপাশি, আমেরিকা থেকে ভারতে পেট্রলিয়াম আমদানিও বেড়েছে তাৎপর্যপূর্ণ হারে। ২০২৪-এর এপ্রিল-অক্টোবর সময়কালে ভারতের মোট পেট্রো-আমদানির ৪.৪৩% আসত আমেরিকা থেকে; ২০২৫-এর একই সময়কালে অনুপাতটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৪৮%। এই দু’টি সময়কালে রাশিয়া থেকে ভারতের পেট্রো-আমদানি ৩৭.৮৮% থেকে কমে হয়েছে ৩২.১৮%। অর্থাৎ, বাণিজ্য ক্ষেত্রে স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার বিষয়ে ভারত যে হুঙ্কারগুলি দিয়েছিল, সেগুলি ফাঁপা। অন্য দিকে, আমেরিকার ঘোষণা থেকে অনুমান করা চলে, ভারত নিজের কৃষিক্ষেত্রও আরও বেশি করে খুলতে চলেছে আমেরিকান পণ্যের জন্য। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের প্রাবল্য বুঝিয়ে দিচ্ছে, কী বিপুল আশঙ্কা রয়েছে কৃষিজীবী মানুষের মনে। কৃষিতে উদার অর্থনীতি কতখানি গ্রহণযোগ্য, তা এক পৃথক বিতর্ক— ভারতকে নিজের মতো করে অবশ্যই সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে, এবং তদনুসারে অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু, আমেরিকার চাপে ভারত করজোড়ে আত্মসমর্পণ করল, এই বার্তাটি ভারতের বিপুল ক্ষতি করবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Donald Trump america US Tariff

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy