E-Paper

অসহনীয়

ভারতের মতো ঘন জনবসতিপূর্ণ এবং অপ্রতুল পরিকাঠামোসম্পন্ন দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে তাপমাত্রার এ-হেন ঊর্ধ্বগতির প্রভাব মর্মান্তিক।

শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৪
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

গত কয়েক বছরে বিশ্ব বিপজ্জনক ভাবে উষ্ণতর হয়ে উঠছে। এখন চর্চার বিষয়, তার প্রবল ধাক্কায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। সম্প্রতি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের গবেষণায় জানা গেল, বিশ্বের জনসংখ্যার যে অংশটিকে তীব্র গরম সহ্য করতে হবে বলে অনুমান করা হচ্ছিল, তার পরিমাণ ২০৫০ সাল নাগাদ দাঁড়াতে পারে ২০১০ সালের হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ। কারণ, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমাগত ব্যবহার। নেচার সাস্টেনেবিলিটি নামক জার্নালে প্রকাশিত রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা যদি শিল্পবিপ্লব-পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় প্রায় ২ ডিগ্রি বৃদ্ধি পায়, তবে বিশ্বের ৩৭৯ কোটি মানুষ তীব্র গরমের সম্মুখীন হবেন, যা সমগ্র জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির মধ্যে অন্যতম হবে ভারত।

ভারতের মতো ঘন জনবসতিপূর্ণ এবং অপ্রতুল পরিকাঠামোসম্পন্ন দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে তাপমাত্রার এ-হেন ঊর্ধ্বগতির প্রভাব মর্মান্তিক। তদুপরি, এই আবহাওয়া দেশের এক বিরাট অংশের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করবে উদ্বেগজনক ভাবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে দরিদ্র নাগরিকও সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে বাতানুকূল যন্ত্র কেনার কথা ভাববেন। ফলে ব্যক্তিগত ঋণ বৃদ্ধি পাবে, যাকে বলা হচ্ছে ‘হিট পভার্টি’। অন্য দিকে, বাতানুকূল যন্ত্রের বহুল ব্যবহার গৃহাভ্যন্তরে স্বস্তি এনে দিলেও বাইরের তাপমাত্রাকে বাড়িয়ে তোলে। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা রাতেও শীতল হতে পারে না। বর্ধিত তাপমাত্রা ভারতের এক বিরাট সংখ্যক অসংগঠিত শ্রমশক্তির পক্ষেও উদ্বেগজনক। তাপপ্রবাহ কায়িক শ্রমনির্ভর পেশায় শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমায়। ফলে ক্ষতি হয় শ্রম-ঘণ্টার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-র হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত তার মোট শ্রম-ঘণ্টার ৫.৮% খোয়াবে তাপপ্রবাহ এবং আর্দ্রতার কারণে। ভারতের অর্থনীতিতে এর প্রভাব গুরুতর, যে-হেতু এর ৯০% শ্রমশক্তিই অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত, এবং অধিকাংশই কায়িক শ্রম-নির্ভর পেশায় নিয়োজিত। অন্য দিকে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য হ্রাস, গবাদি পশুর মৃত্যু এবং দুর্বল খাদ্য-নিরাপত্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত।

পরিবারে মেয়েদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি যেখানে বহুলাংশে উপেক্ষিত, সেখানে তাপপ্রবাহের কারণে জলশূন্যতা, হিট স্ট্রোক, প্রজনন সংক্রান্ত জটিলতার সৃষ্টি হলে ক’জন মেয়ে সুচিকিৎসার সুযোগ পাবেন, প্রশ্ন থেকে যায়। তদুপরি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পানীয় জলের ভান্ডারকে হ্রাস করে। জলের খোঁজে সময় এবং শ্রম— দুইয়েরই অপচয় ঘটে। যে-হেতু এ দেশের দরিদ্র পরিবারগুলিতে জলের জোগানের দায়িত্ব মূলত মেয়েদেরই, তাই গৃহকর্মে সময় অধিক অতিবাহিত হলে দেশের শ্রমশক্তিতে মেয়েদের যোগদান হ্রাস পাবে লক্ষণীয় ভাবে। গৃহকর্মে সাহায্যের জন্য পরিবারের কন্যাটির পড়াশোনার সময় কমবে। বাড়বে স্কুলছুট। তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই বহুমুখী অভিঘাত সামলাতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রস্তুত কি? সদ্যসমাপ্ত কেন্দ্রীয় বাজেটে কার্বন শোষণের পরিকাঠামো গড়তে বিপুল লগ্নি, অথচ দূষণ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে বরাদ্দ হ্রাসের গোলকধাঁধায় প্রস্তুতির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন থেকেই গেল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Heat Wave

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy