E-Paper

অধিকারের সীমা

মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করার অধিকার অবশ্যই সমাজের রয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ যেমন সে কাজ করে, তেমনই করে গণমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমও।

শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:২৫

মাসিক বিদ্যুতের বিল মেটানোর ক্ষমতা যাঁদের আছে, তাঁদেরও বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া নিয়ে কি প্রশ্ন তোলা কর্তব্য নয়? তামিলনাড়ু বিদ্যুৎ বণ্টন নিগমের দায়ের করা এক মামলার পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য শীর্ষ আদালতের দুই বিচারপতির বেঞ্চের এই পর্যবেক্ষণ শিরোধার্য করেও মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে, আদালতই বলেছে, এই পর্যবেক্ষণ শুধু এই নির্দিষ্ট রাজ্যটির প্রসঙ্গে নয়। এখানেই প্রশ্ন: মহামান্য শীর্ষ আদালত কি আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগের পরিসরে অহেতুক হস্তক্ষেপ করছে? পরিষেবার বিনিময়ে টাকা দেওয়ার সাধ্য যাঁদের রয়েছে, তাঁদেরও বিনামূল্যে পরিষেবা দেওয়া নিঃসন্দেহে সুশাসনের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। বিশেষত ভোটমুখী খয়রাতির প্রবণতা রাজ্যগুলির রাজকোষের উপরে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করছে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু, দেশের শীর্ষ আদালত যখন কঠোর সমালোচনা করে বলে যে, রাজস্ব-উদ্বৃত্ত রাজ্যগুলিরও কর্তব্য সেই টাকা সড়ক, হাসপাতাল বা বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোগত উন্নতির কাজে ব্যয় করা, তখন দু’টি সমস্যা তৈরি হয়। এক, সরকার বা প্রশাসনের কোন পথে চলা বিধেয়, বিচারবিভাগের সেই পরামর্শ ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রয়োজনীয়; এবং দুই, রাজকোষের শ্রেয় ব্যবহার কী, সে বিষয়ে জনপরিসরে যে পরস্পর-প্রতিস্পর্ধী ধারণাগুলি রয়েছে, তার একটি নির্দিষ্ট পাল্লায় প্রভূত গুরুত্ব সংযোজিত হয়। রাজকোষের টাকায় দরিদ্রতর জনগোষ্ঠীর জন্য ‘খয়রাতি’ না করে তা ‘সর্বজনীন উন্নয়ন’-এ ব্যয় করা হোক, এই অবস্থানটি মূলত অবস্থাপন্ন শ্রেণির। লক্ষণীয় যে, আদালত পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার বিরোধিতা করেনি। কিন্তু, বক্তব্যের সার্বিক সুরটি সে উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে, তা ভুললে চলবে না।

এ কথার অর্থ এই নয় যে, রাজ্য সরকারগুলি যে পথে হেঁটে চলেছে, তা প্রশ্নহীন ভাবে সমর্থনযোগ্য। একেবারেই নয়। পশ্চিমবঙ্গে ভোট-অন-অ্যাকাউন্টের নামে স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থ প্রতিমন্ত্রী যে কাণ্ডটি করেছেন, তার কঠোর সমালোচনা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই প্রকাশিত হয়েছে (‘যৌক্তিক সীমা’, ৭/২)। কিন্তু, সরকার কোন নীতি অনুসরণ করবে, সে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার যে সরকারেরই, সে কথাও অনস্বীকার্য। সরকারের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমত। তাকে অসম্মান করে গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা অসম্ভব। সরকার যদি এমন সিদ্ধান্ত করতে থাকে যা মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পক্ষে নেতিবাচক, তা হলে জনতার রায়েই সেই সরকারের পতন ঘটবে। সাধারণ মানুষ শুধু খয়রাতির জন্য লালায়িত, নিজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সম্বন্ধে তাঁদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, ফলে তাঁদের সিদ্ধান্তের উপরে ভরসা করা যায় না— এমন একটি সংশয় সুপ্রচলিত, এবং তার একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি-পরিচয়ও আছে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, এ-হেন অবিশ্বাস গণতন্ত্রের সঙ্গে মানানসই নয়।

মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করার অধিকার অবশ্যই সমাজের রয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ যেমন সে কাজ করে, তেমনই করে গণমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমও। মহামান্য আদালত বিচার করবে যে, প্রশাসনিক বিবেচনার ক্ষেত্রে কত দূর হস্তক্ষেপ করা বিধেয়। সমাজের কোন মতটির পাশে দাঁড়ানো বণ্টনের ন্যায্যতার যুক্তির অনুসারী, ভাবতে হবে সে কথাও। পাশাপাশি আরও একটি কথা বৃহত্তর সমাজের আলোচনার পরিসরে আসা প্রয়োজন— গত এক দশকে অর্থনৈতিক যুক্তরাষ্ট্রীয়তার যুক্তিতে যে পরিবর্তন ঘটেছে, সে কথা। কেন্দ্রের বণ্টনযোগ্য রাজস্ব ভান্ডারে রাজ্যগুলির ভাগ বেড়েছে, কিন্তু এক দিকে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলির ঘাড়ে উন্নয়ন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান বোঝা চাপিয়ে চলেছে, আর অন্য দিক সেস ইত্যাদি আরোপ করে রাজ্যগুলিকে রাজস্বের ভাগ থেকে বঞ্চিত করছে। রাজ্যের আর্থিক সঙ্কটের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব কতটা, সে কথাটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

electric bill West Bengal government Tamil Nadu

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy