উনিশ বছরের একটি মেয়ে বিয়ে করেছিল এক দলিত ছেলেকে, বাড়ির অমতে। এই ‘অপরাধ’-এ মেয়েটির বাবা ও অন্যরা মিলে সন্তানসম্ভবা মেয়েটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে গত বছর ডিসেম্বরে, কর্নাটকে। ভিন জাতে, বর্ণে বা ধর্মে বিয়ে করলে এই একুশ শতকেও নেমে আসছে ঘরের ও বাইরের হিংসা— বিশেষত সেই রাজ্যগুলিতে, যেখানে সমাজ এখনও জাতপাত, ধর্ম, পরিবারের সম্মান ও ঐতিহ্য নিয়ে অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর, গোঁড়া। অথচ প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন নাগরিকের বিবাহের ক্ষেত্রে তাঁদের স্বাধিকার তথা স্বাধীনতা ভারতে সংবিধানসিদ্ধ, রাষ্ট্রও তা নিশ্চিত করতে বাধ্য। এই প্রেক্ষিতেই কর্নাটক রাজ্য সরকারের সম্প্রতি পাশ করা ‘কর্নাটক ফ্রিডম অব চয়েস ইন ম্যারেজ অ্যান্ড প্রিভেনশন অ্যান্ড প্রোহিবিশন অব ক্রাইমস ইন দ্য নেম অব অনার অ্যান্ড ট্রাডিশন বিল’টির গুরুত্ব আত্যন্তিক— ভিন্ন জাতি বা বর্ণে বিবাহের ফলে উদ্ভূত হিংসা ও পরিবারের ‘সম্মান রক্ষার্থে হত্যা’র ঘটনা মুছে দিতে কারাবাস, জরিমানা-সহ কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
বিয়ে ও সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নাগরিকের অধিকার নিঃশর্ত; বাবা-মা, পরিবার, জাতি-গোষ্ঠী, সমাজ বা রাষ্ট্র, কেউ সে পথে বাধা দিতে পারে না— ভারতের একটি রাজ্য এর আইনি নিশ্চয়তা ও সুরক্ষা দিচ্ছে, এটি আশার কথা। কারণ ভারতের অন্য অনেক রাজ্যেই এই সুরক্ষা তো নেই-ই, উপরন্তু প্রশাসন ও পুলিশ পর্যন্ত রক্ষকের বদলে ভক্ষক হয়ে উঠছে: গুজরাতে নিয়ম হয়েছে, বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করতে হলে আগে হবু দম্পতির বাবা-মায়েদের পরিচয়-নথি জমা দিতে হবে; হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যে ভিন্ন ধর্মে বিয়ের ক্ষেত্রে নাগরিকের অধিকার গ্রাস করে নিচ্ছে ধর্মান্তরণের প্রশ্ন— বিবাহিত দম্পতিকে ভয় দেখিয়ে, মারধর করে, প্রাণে মারার হুমকি দিয়ে এমনকি মেরে ফেলেও পার পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তেরা, রাজ্য প্রশাসনই এ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের প্রচ্ছন্ন বা প্রকাশ্য সমর্থক বলে। এ-ই যেখানে বহু রাজ্যের চেনা ছবি, সেখানে কর্নাটক সরকার নতুন আইনে শুধু কড়া শাস্তির কথা বলেই ক্ষান্ত হয়নি, এও বলেছে যে এই আইনের বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য সব রাজ্য সরকারি কর্মীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ ও ক্ষমতা প্রদান করা হবে। অর্থাৎ একই দেশের অন্য অনেক রাজ্যে যেখানে নাগরিক-সমাজের একাংশের পাশাপাশি সরকারও ভিন্ন জাতি ধর্মে বিবাহ করা নাগরিকের প্রতি বিদ্বিষ্ট, কর্নাটক সেখানে সমষ্টি-নাগরিক ও প্রশাসনকে আইনি, সামাজিক ও নৈতিক ভাবে করে তুলতে চাইছে নাগরিক অধিকারের প্রতি সংবেদনশীল, সহভাগী।
নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা যে ইদানীং এত বার বলতে হচ্ছে, একটি রাজ্যে আইন পাশ করে ভিন জাতে বিয়ের সুরক্ষা দিতে হচ্ছে, এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে: ভারতে পরিবার ও সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্রও এখনও কট্টর অভিভাবকতন্ত্র কাটিয়ে উঠতে পারেনি। খাদ্য, পোশাক, ধর্মাচরণ ইত্যাদি তবু কৌম সংস্কৃতিভিত্তিক, কিন্তু এক জন নাগরিকের সজ্ঞানে ও পূর্ণ সম্মতিতে অন্য এক নাগরিককে দাম্পত্যসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ায় আর কারও আপত্তি বা বাগড়া গ্রাহ্য হতে পারে না, সরকার বা রাষ্ট্রের বিমুখতা তো দুঃস্বপ্নেও নয়— এমনই কি হওয়ার কথা ছিল না? একটি রাজ্য অন্তত তা আইনবলে করে দেখাল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)