Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০১ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

আলোচনা ধাতে নাই

২৫ নভেম্বর ২০২১ ০৫:১৮
ফাইল চিত্র।

ফাইল চিত্র।

গণতন্ত্র হইল আলোচনার মাধ্যমে শাসন— গভর্নমেন্ট বাই ডিসকাশন। ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক ওয়াল্টার ব্যাজট-এর এই কথাটিকে জনপ্রিয় করেন জন স্টুয়ার্ট মিল। গ্রিসের প্রাচীন নগর-রাষ্ট্র হইতেই আলোচনা-ভিত্তিক শাসনতন্ত্রের ধারণাটি ইউরোপে সঞ্চারিত হয়। আলোচনার অধিকারটি অবশ্য বরাবরই সীমিত ছিল। আথেন্সের গণ-আলোচনার আসরে কেবল নাগরিক পুরুষদেরই স্থান মিলিত, নারী এবং দাসেরা সেখানে অপাঙ্‌ক্তেয়। মিল-এরও বিশ্বাস ছিল— সুশিক্ষিত নাগরিকরাই আইনসভায় সমাজ এবং রাষ্ট্র চালনার নীতি লইয়া আলোচনার অধিকারী। ব্রিটিশ শাসনের সূত্রে ভারতের মতো দেশেও সংসদ এবং বিধানসভার পরিশীলিত বিতর্কই গণতান্ত্রিক আলোচনার পরাকাষ্ঠা হিসাবে গণ্য হইয়া আসিয়াছে, আদর্শ হিসাবে এখনও তাহাই স্বীকৃত। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আইনসভার আলোচনা অনেক কাল যাবৎ তাহার পুরানো মর্যাদা হারাইয়াছে। বহুলাংশে তাহার স্থান লইয়াছে সংখ্যার জোর এবং অসংযত আক্রমণ।

তবে, এই দীর্ঘ অবক্ষয়ের মাপকাঠিতেও নরেন্দ্র মোদীর শাসনপর্বটি অভূতপূর্ব। আলোচনায় এই শাসকদের প্রবল অরুচি। প্রশাসনিক হুকুম দিয়া যাহা করা যায় না, আইন আবশ্যক হয়, তাহার জন্য অর্ডিনান্স বা অধ্যাদেশই তাঁহাদের প্রিয়তম প্রকরণ। কিন্তু অধ্যাদেশের মেয়াদ বেশি নহে, সংসদে বিল আনিতেই হয়। সেখানে আলোচনার একটি বহিরঙ্গও রাখিতেই হয়। কোনও ক্রমে সেই বহিরঙ্গটুকু বজায় রাখাই মোদী সরকার গণতন্ত্রের পক্ষে যথেষ্ট বলিয়া মনে করে। কৃষিপণ্যের বাজার খুলিয়া দিবার জন্য গত বছর জুন মাসে তিনটি অধ্যাদেশ আনিবার তিন মাস পরেই সংসদে— অতিমারির ‘সুযোগে’— তিনটি কৃষি আইন ঝড়ের বেগে পাশ করাইয়া লইয়া শাসকরা ভাবিয়াছিলেন, গণতন্ত্রের দায় মিটিয়া গেল। উত্তর-পশ্চিম ভারতের কৃষকরা তাঁহাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করিয়া যে প্রতিরোধ গড়িয়া তোলেন, তাহা এখন ইতিহাস। সেই ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে বিস্তীর্ণ রহিয়াছে মোদী সরকারের অ-গণতান্ত্রিক মানসিকতা। আন্দোলনের প্রথম পর্বে কয়েক সপ্তাহ আলোচনার নাটক চলিয়াছিল বটে— কিন্তু তাহার অসারতা বুঝিতে কাহারও অসুবিধা হয় নাই। অচিরেই আলোচনার কুনাট্য বন্ধ হইয়া যায়। আন্দোলনকারীরা প্রথম হইতেই প্রধানমন্ত্রীর সহিত সরাসরি কথা বলিতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সেই অভ্যাস নাই, তিনি আপন পঞ্জিকা মানিয়া মাঝে মাঝে আবির্ভূত হন ও বাণী বিতরণ করেন। লক্ষণীয়, শেষ অবধি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণাও কোনও আলোচনার ফল নহে; একতরফা আইন চাপাইয়া দিতে না পারিয়া সরকার একতরফাই নতিস্বীকার করিল।

অথচ কৃষক আন্দোলন একটি বড় সুযোগ দিয়াছিল। গণতন্ত্রের প্রকরণ হিসাবে আলোচনাকে আইনসভার সীমিত বলয় হইতে বৃহত্তর জনপরিসরে প্রসারিত করিবার সুযোগ— যে কৃষকদের কল্যাণের নামে নূতন আইন প্রণয়ন, এই বিষয়ে তাঁহাদের মতামত শুনিবার সুযোগ, তাঁহাদের দাবি অনুসারে আইন সংশোধনের সুযোগ, আবার আইনের প্রয়োজন ও উপযোগিতা তাঁহাদের বুঝাইবারও সুযোগ। সেই গণতান্ত্রিক কথোপকথন ও আদানপ্রদান হইতে নূতন পথের সন্ধান মিলিতে পারিত, গণতন্ত্রের অনুশীলন সমৃদ্ধ ও ফলপ্রসূ হইত। আজ প্রধানমন্ত্রী ‘কৃষকদের বুঝাইতে পারি নাই’ বলিয়া আক্ষেপের সুর ভাঁজিতেছেন, কিন্তু চোদ্দো মাস ধরিয়া বুঝাইবার, এবং বুঝিবার, পরম সুযোগ তিনি হেলায় হারাইয়াছেন। ইহা তাঁহার বা তাঁহার সরকারের ভুল বলিয়া মনে করিবার কোনও উপায় নাই, আলোচনা না-করিবার এই রীতিই তাঁহাদের ধর্ম। এই ধর্ম গণতন্ত্রের স্বধর্মের বিপরীত। কৃষক আন্দোলন সেই সত্যকেই দেশের ও দুনিয়ার সম্মুখে উন্মোচিত করিয়া দিয়াছে।

Advertisement

আরও পড়ুন

Advertisement