E-Paper

বিদ্বেষ-বিষ

এসআইআর ও তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ভোটারদের ট্রাইবুনালে আবেদন এই মুহূর্তে এ রাজ্যের প্রাক্‌-নির্বাচনী আবহে মনোযোগের কেন্দ্র। তৃণমূল বিজেপি সিপিএম কংগ্রেস সব দলই এই পরিস্থিতিতে কমবেশি সাবধানি।

শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:১০

আর একটি বিধানসভা নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ। শেষ মুহূর্তের প্রচারে সব রাজনৈতিক দল ও নেতা-প্রার্থীরাই ব্যস্ত, এই সময়েই ছোটে তুমুল বাক্যস্রোত। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলির অভিজ্ঞতা থেকে পশ্চিমবঙ্গবাসীর বিলক্ষণ জানা এই সত্য— ভোটের সময় দুর্বাক্য, বিশেষত ঘৃণাভাষণ বেড়ে যায় বহুগুণ। সম্প্রতি এক জাতীয় পরিসংখ্যানেও এর প্রমাণ পাওয়া গেল: শেষ লোকসভা নির্বাচনের বছর অর্থাৎ ২০২৪-এ ভারতে ঘৃণাভাষণ ও বিদ্বেষমূলক সভার সংখ্যা তার আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৭৪.৪ শতাংশ! বছরভর মোট ১১৬৫টি ঘটনার মধ্যে নির্বাচনকালীন ঘটনার সংখ্যা ৩৭৩টি; বিপজ্জনক ঘৃণাভাষণের ঘটনা ২৫৯টি, অস্ত্রধারণের ডাক দেওয়া হয়েছে ১২৩টি ক্ষেত্রে, বয়কটের আহ্বান ১১১টি। ঘৃণাভাষণের প্রধান লক্ষ্য হয়েছেন মুসলমানরা (১০৫০টি ঘটনা), খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার হয়েছে ১১৫টি ক্ষেত্রে। এখানেই শেষ নয়, প্রকাশ্যে বা জনসভায় ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর এই ঘটনাগুলির প্রায় ৮৫ শতাংশই সমাজমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার অথবা আপলোড করা হয়েছে।

দু’বছর আগের এই বাস্তবকে যে আর ‘প্রবণতা’ বলা চলে না, রাজনৈতিক দলগুলির নেতানেত্রীদের যে এ জিনিস ‘অভ্যাস’-এ দাঁড়িয়েছে, এত দিনে তা প্রমাণিত। গত লোকসভা নির্বাচনের আবহে পশ্চিমবঙ্গে ঘৃণা-সম্বলিত সভার উদাহরণ মিলেছে ২৭টি, উত্তরপ্রদেশ (২৪২) ও মহারাষ্ট্রের (২১০) তুলনায় অনেক কম— এ তথ্যে এ রাজ্যের শুভবোধসম্পন্ন নাগরিকেরা হয়তো খানিক আশ্বস্ত হতে পারেন। কিন্তু শেষাবধি স্বস্তির খুব কারণ নেই— কেন্দ্রে শাসক বিজেপি গত লোকসভা নির্বাচনে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’দের লক্ষ্য করে ঘৃণা ছড়িয়েছিল, এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে ‘অনুপ্রবেশকারী’, পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস পাল্টে দেওয়া ‘রোহিঙ্গা’ ও সংখ্যালঘুদের তাক করে; এবং পশ্চিমবঙ্গবাসীর একাংশ এই ঘৃণা আত্মস্থ করে নিজেরাও বিদ্বিষ্ট হয়ে উঠেছেন; নেতাদের বলা কুকথাকে এক রকম সামাজিক বৈধতা দিচ্ছেন। রাজনীতিতে ব্যক্তিগত সৌজন্য প্রদর্শন প্রায় মুছে যেতে বসেছে, বিশেষ করে ভোটের আবহে নেতা-নেত্রীরা যে পারস্পরিক ব্যক্তি-আক্রমণ করে বসেন তাতে তাঁদের শিক্ষা ও রুচি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আবার এঁরাই যখন একটি বিশেষ ধর্ম, সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্য অগণিত মানুষকে হিংস্র উস্কানি দেন, তখন এটুকু অন্তত বুঝতে বাকি থাকে না— জনতার সমর্থনে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে বসে এঁরা জনতারই সর্বনাশ করবেন।

এসআইআর ও তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ভোটারদের ট্রাইবুনালে আবেদন এই মুহূর্তে এ রাজ্যের প্রাক্‌-নির্বাচনী আবহে মনোযোগের কেন্দ্র। তৃণমূল বিজেপি সিপিএম কংগ্রেস সব দলই এই পরিস্থিতিতে কমবেশি সাবধানি। তাই সময়টা ভোটের প্রচারের তুঙ্গমুহূর্ত হলেও, সরাসরি হিংসার উস্কানি এখনও পর্যন্ত হয়তো শোনা যায়নি— কোনও দল বাংলা ভাষার সুরক্ষা নিয়ে, কোনও দল বাঙালির মাছ-মাংস খেতে পারা না-পারা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ। নির্বাচন কমিশনের অ-ভূতপূর্ব কড়াকড়ি ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রবল উপস্থিতি পশ্চিমবঙ্গে নেতাদের রাজনৈতিক ঘৃণাভাষণ দমিয়ে রাখছে, এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়; নির্বাচন-পূর্ব আদর্শ আচরণবিধিরও যাঁরা পরোয়া করেন না, তাঁদের বিদ্বেষবিষ আটকাবে কে। এখনও অবধি ভোটের প্রচারে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’, ‘রোহিঙ্গা’ ইত্যাদি ‘সুভাষিত’র প্রয়োগে মেরুকরণের চেষ্টা ক্রমাগত হয়ে চলেছে; সরাসরি অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া বা সামাজিক/অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক তত শোনা যায়নি। অতীতের পরিসংখ্যান এক বড় সিঁদুরে মেঘ, সামনের কয়েকটি দিনে পশ্চিমবঙ্গে শান্তি, সম্প্রীতি ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। সঙ্কীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির মতলবে নেতারা যদি তা না করেন, বৃহৎ স্বার্থে তা করতে হবে নাগরিকদেরই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Hate speech Political Campaign Minority

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy