E-Paper

বিপদসঙ্কেত

প্রধানমন্ত্রী মোদী যে কথাগুলি বলেছেন, বৈশ্বিক স্তরে বহু দেশই তা অংশত অনুসরণ করছে বেশ কিছু দিন ধরে। যেমন, জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ নীতি অনুসরণ ইত্যাদি।

শেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ ০৬:১১
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। —ফাইল চিত্র।

অতিমারি যদি এই শতাব্দীর বৃহত্তম সঙ্কট হয়, তবে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ এই দশকের বৃহত্তম সঙ্কট— জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি দেশবাসীকে তাঁদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর কাছে যে দাবিগুলি করেছেন, তার যাথার্থ্য বিচারের আগে বলা প্রয়োজন যে, শাসক দলের নেতা হিসাবে নয়, দেশবাসীর কাছে তাঁর আবেদন করা উচিত দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবেই। এবং, দলীয় মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী বার্তা দিতে পারেন না। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি যতখানি গুরুতর বলে দাবি করছেন, সত্যই সে কথাটিতে বিশ্বাস করলে তাঁর কর্তব্য ছিল সরকারি মঞ্চ থেকে কথাগুলি বলা। জাতির উদ্দেশে ভাষণ তিনি দিয়েই থাকেন, তাঁর ‘মন কি বাত’ প্রকাশ করারও পরিসর আছে— সে মঞ্চগুলি ব্যবহার করাই বিধেয় ছিল। দ্বিতীয় কথা হল, পশ্চিম এশিয়ার সঙ্কট গত এক সপ্তাহে তৈরি হয়নি— আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে অঞ্চলটি উত্তপ্ত, এবং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় তার প্রবল প্রভাব পড়ছে। ভারতও কার্যত প্রথম দিন থেকেই এই সঙ্কটের আঁচ পাচ্ছে। তা হলে, পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনপর্ব মেটার আগে অবধি সঙ্কটের কোনও বার্তা প্রধানমন্ত্রীর তরফে পাওয়া গেল না কেন, সে প্রশ্নটিও অনিবার্য। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকারের ‘কোনও সমস্যা নেই’-বাচক অবস্থা থেকে দেশ সরাসরি যে-হেতু প্রধানমন্ত্রীর ‘এই দশকের বৃহত্তম সঙ্কট’-সূচক অবস্থানে পৌঁছে গেল, ফলে বিপদের প্রকৃত মাপ সম্বন্ধে দেশবাসীর স্পষ্ট ধারণা না থাকাই স্বাভাবিক। এবং, সেই অস্বচ্ছতা থেকেই তৈরি হয় আতঙ্ক, যা অর্থব্যবস্থা ও সমাজ, উভয়ের পক্ষেই মারাত্মক। ফলে, বিপদের প্রকৃত চরিত্র সম্বন্ধে বিশেষণহীন পরিমাপযোগ্য তথ্য প্রয়োজন ছিল। সে তথ্য এখনও মেলেনি।

প্রধানমন্ত্রী মোদী যে কথাগুলি বলেছেন, বৈশ্বিক স্তরে বহু দেশই তা অংশত অনুসরণ করছে বেশ কিছু দিন ধরে। যেমন, জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ নীতি অনুসরণ ইত্যাদি। এই মুহূর্তে ভারতের সঙ্কট দ্বিস্তরীয়— প্রথমত, বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের অনিশ্চয়তা বিপুল চাপ তৈরি করছে; এবং দ্বিতীয়ত, ডলারের সাপেক্ষে টাকার দামে ধারাবাহিক পতন ঘটায় ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেড়েছে। এই অবস্থায় জ্বালানি বাঁচানোর চিন্তা যথাযথ। কিন্তু, অত্যাবশ্যক পণ্য বাদে অন্য ক্ষেত্রে কেনাকাটায় লাগাম টানার মতো পরামর্শ অর্থব্যবস্থার উপরে কী প্রভাব ফেলবে, সে কথাও ভেবে দেখা জরুরি। চাহিদা কমা মানেই শিল্পক্ষেত্রে শ্লথতা আসবে, তার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানের উপরে। এ পথে হাঁটলে অর্থব্যবস্থার গতিভঙ্গ কার্যত নিশ্চিত পরিণতি। ভোজ্য তেলের ব্যবহার কমানোর পরামর্শটি আবার নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। দেশবাসীকে পরামর্শ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তার পরিণতি বিবেচনা করেছেন কি?

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে বিপজ্জনক রকম টান পড়াতেই এহেন সতর্কতা। সে বিপদ অবশ্য যুদ্ধের কারণে ঘটেনি— তার আগে থেকেই বিপুল পরিমাণ লগ্নি ভারতের বাজার ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিদেশি বিনিয়োগ (এফআইআই) এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ভারত ছেড়েছে তো বটেই; তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, তার একটা বড় অংশ হল, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিদেশে বিনিয়োগ। বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারত কেন যথেষ্ট লাভজনক গন্তব্য হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে না, সেই আত্মসমীক্ষা করা বিধেয়। অর্থব্যবস্থা পরিচালনায় কোন ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে টাকার দাম এমন তলানিতে ঠেকেছে, ভাবা প্রয়োজন সে কথাও। দেশের অর্থব্যবস্থার বিপদে নাগরিকরা অবশ্যই নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন; কিন্তু যে ব্যর্থতা প্রথমত এবং প্রধানত সরকারের, নাগরিককে তার দায় বহন করতে বললে মুশকিল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Narendra Modi West Asia Work from home Petrol Diesel Price Hike Fuel Crisis

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy