E-Paper

জরুরি পরাভব

শুক্রবার সংসদে ভোটাভুটিতে বিলের পরাজয়, এবং শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জাতির উদ্দেশে ভাষণের ধরন থেকে অনুমান করা যেতে পারে, শাসক দল মনে করে, দেশের নারী-নাগরিকদের তাঁরা অতি সহজেই ভুল বুঝিয়ে দিতে পারবেন— আরও পরিষ্কার করে বললে, বোকা বানিয়ে দিতে পারবেন।

শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫০

দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার সংবিধান সংশোধন আইন, ২০২৬ পাশ করানোর জন্য যে ভাবে তিন বছর আগে পাশ হয়ে যাওয়া মহিলা সংরক্ষণ বিলটিকে ওই বিলের সঙ্গে জুড়ে নিয়ে এক আশ্চর্য পদ্ধতিতে সংসদে এ বার পেশ করা হল— তাকে কেবল ‘কৌশল’ বলে না, ‘ছল-বল’ও বলে। ‘ইন্ডিয়া ব্লক’-এর নেতৃত্বে বিরোধীরা এককাট্টা ভোট দিয়ে সেই বিলকে আটকে দিলেন। ফলে ছলে-বলে-কৌশলে যে বিপজ্জনক বিল পাশ করানো হচ্ছিল, তার জন্য অন্তত কিছুটা আলোচনার সময় মিলল। সন্দেহ নেই, বিজেপির তুলনায় বিরোধী নেতারা কৌশল থেকে বল, সব কিছুতেই অনেক পিছিয়ে, একতা নিয়ে তো কোনও প্রশ্নই অবশিষ্ট নেই। তাই সংবিধান সংশোধন করে ডিলিমিটেশন বিল-এর আগে প্রয়োজনীয় বিচার-বিবেচনা, বিরোধী মতামত আলোচনার অবকাশ মেলার সংবাদটি অত্যন্ত শুভ। অনেক দিন পর সংসদীয় কার্যক্রম দেখে ভারতের গণতান্ত্রিক রীতিপদ্ধতির উপর নতুন করে কিছু আশা তৈরি হওয়ার অবকাশ মিলল। বিরোধীদেরও আর এক বার বোঝার সুযোগ হল যে, প্রত্যহ যে শাসক আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাঁরা সরগরম, তার বিরুদ্ধে কী ভাবে লড়তে হবে। গত বছর দশেক ধরে সংখ্যার কাছে পদানত হয়ে শাসকের সমস্ত সংস্কার প্রস্তাব চোখের পলকে আইনে পরিণত হয়ে গিয়েছে, তার মধ্যে অনেকগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবপূর্ণ। ডিলিমিটেশন বিলটি তেমনই আর একটি— বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার অসমতা তা অনেকখানি বাড়িয়ে দিতে পারে, এবং জনসংখ্যার বৃদ্ধি অনুযায়ী এই ভাবে কোনও প্রদেশের ক্ষমতাবৃদ্ধির অর্থ দাঁড়াতে পারে, আর্থিক ভাবে উন্নত ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল প্রদেশগুলিকে রাষ্ট্রের তরফে শাস্তিদানের বন্দোবস্ত। বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল, বিপজ্জনকও বটে। ভারতীয় রাষ্ট্রের চেহারা এতে চিরতরে পাল্টে যেতে পারে, অন্যায্য ভাবে।

তা ছাড়া, শুক্রবার সংসদে ভোটাভুটিতে বিলের পরাজয়, এবং শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জাতির উদ্দেশে ভাষণের ধরন থেকে অনুমান করা যেতে পারে, শাসক দল মনে করে, দেশের নারী-নাগরিকদের তাঁরা অতি সহজেই ভুল বুঝিয়ে দিতে পারবেন— আরও পরিষ্কার করে বললে, বোকা বানিয়ে দিতে পারবেন। নারী ক্ষমতায়নের বিল বিরোধীরা আটকে দিয়েছেন বলে বিজেপির প্রচার কেবল ভুল নয়, অন্যায়।কেননা ২০২৩ সালে এই বিলটি সর্বসম্মতিক্রমেই পাশ হয়েছিল, এবং তার পর থেকে তা অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে— বিরোধীদের কারণে নয়— শাসক দলেরই কারণে! এই মুহূর্তেও বিরোধী দলগুলি সেই বিল কার্যকর করতে রাজি, যদি তা ডিলিমিটেশন বিল থেকে বিযুক্ত করে নেওয়া হয়। মোদী সরকার সত্যিই নারী প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়াতে চাইলে ইতিমধ্যেই পাশ-হওয়া বিলটি এখনই প্রয়োগ করছে না কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ চাইবে না বলেই প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দল ভাবছেন।

লক্ষণীয়, মোদী সরকারের গত বারো বছরে এই প্রথম কোনও সরকারি বিল ভোটাভুটিতে পরাস্ত হল। এ বারের ঘটনা আর একটি কথাও বুঝিয়ে দেয়। যে সময়ে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু দুই বিরোধী-শাসিত রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের একেবারে চূড়ান্ত প্রহর সমাগত, তখন বিজেপি নেতৃত্ব যে যেন তেন প্রকারেণ দিল্লিতে এই অতি গুরুতর ও বিতর্কিত বিলটি পাশ করানোর অতিসক্রিয়তা দেখাল, তার প্রকৃত লক্ষ্য হয়তো ২০২৯ সালে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন। তার আগে বিজেপি চায়, তার অনুকূলে রাজ্য-ভিত্তিক আসনের অনুুপাত তৈরি করতে। গত জাতীয় নির্বাচনে যে হেতু বিজেপির সাফল্য প্রত্যাশা অপেক্ষা অনেক কম ছিল, পরের ভোটের আগে তাদের আটঘাট বাঁধার চেষ্টা সহজবোধ্য। তবে আশা করা যায়, বিরোধী-শাসকের ভারসাম্যই যে গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ, এ বারের বিল-পরাভব পর্ব সে কথা বুঝিয়ে দিয়ে গেল— কেবল শাসক দলকে নয়, বিরোধীদেরও।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Women Reservation Bill Women Reservation Lok Sabha Central Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy