কুনাট্য অনেক সময়ই রঙ্গে পরিণত হয়। অনেক সময় আবার কুনাট্য হয়ে ওঠে তীব্র প্রতারণার উপর একটি পর্দার মতো, যার নেপথ্যে বাস্তব সত্য, তথ্য, হিসাব সবই উধাও করে দেওয়া যায়। ভারতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিরোধী নেতাদের উদ্দেশে নাটক না করার ব্যঙ্গবঙ্কিম অনুরোধ জানিয়েছিলেন। অধিবেশন শুরু হতেই দেখা গেল, সেখানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও নেতারা যা করছেন, তা কেবল নাটক নয়, প্রতারণা-মূলক কুনাট্য। বিষয়টি অতি গুরুতর, কেননা এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মল্লযুদ্ধের মোড়কে আসলে বঞ্চিত করা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণকে। এই প্রসঙ্গে যে নামটি প্রথম ও প্রধান— তিনি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তাঁর আচরণ, বক্তব্য, তথ্য— সবই অতীব আপত্তিজনক। এত গুরুতর পদে আসীন কোনও ব্যক্তি যে এই ভাবে স্পষ্টত নিরপেক্ষতার দায় চুকিয়ে দলীয় সঙ্কীর্ণতায় অবগাহন করতে পারেন, প্রবল দর্পে উচ্চরবে ভুল তথ্য ও বিকৃত বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন, তা ভারতীয় গণতন্ত্রের মালিন্যময় ইতিহাসেও একটি বিশিষ্ট দৃষ্টান্ত হয়ে থাকার মতো। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদরা তাঁর বিরুদ্ধতা করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু নির্মলা সীতারামন তা শোনার ভব্যতা দেখাননি, কোনও কথাতেই পাত্তা না দিয়ে সরবে বক্তৃতা জারি রেখেছেন।
অথচ, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রাখার ঘটনা এখন কেন্দ্রীয় সরকারও অস্বীকার করে না। ২০২২ সালের ৮ মার্চের হিসাবে মনরেগা প্রকল্পে তিন হাজার কোটির অধিক টাকা প্রাপ্য এই রাজ্যের, যা এখনও দেয়নি নরেন্দ্র মোদী সরকার। যুক্তরাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক সমস্ত রীতিনীতি সমূলে অগ্রাহ্য করে রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ আটকে রাখার এই রাজনৈতিক পরিকল্পনা, এক কথায়, ঘৃণ্য। এ দিকে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন পেশ করেছেন সেই পরিচিত যুক্তি, পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় যোজনা রূপায়ণে কোনও স্বচ্ছতা নেই। ২০২২ সালের মার্চের পর একশো দিনের প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গে টাকার জোগান বন্ধ করে দেওয়ার কারণ— কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা মেনে চলেনি রাজ্য। কত টাকা কী ভাবে ব্যয় করা হয়েছে কিংবা হয়নি, তার চুলচেরা সংখ্যা নিয়ে অবশ্যই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে বিসংবাদ অনন্ত। কিন্তু আসল কথা হল, যদি ধরে নেওয়া যায় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা থেকেছে, সে ক্ষেত্রেও কি এই ভাবে পাঠশালার দাপুটে গুরুমশাইয়ের মতো রাজ্যের বরাদ্দ এত বছর ধরে বন্ধ রাখা উচিত? পাঠশালার প্রসঙ্গ উঠল বলে বলা যায় যে, একুশ শতকের বিদ্যায়তনে শিক্ষকরাও ছাত্রছাত্রীদের উপর যথেচ্ছ শাস্তিমূলক ব্যবহার করতে পারেন না, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তার নিষ্পত্তিতে বাধ্য থাকেন। তা ছাড়া, এ কথা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভবত অসম্ভব যে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা চলেছে, বাকি সর্বত্র— বিজেপি-শাসিত রাজ্যে— সুশাসনের ঢল প্রবহমান। মনরেগা ছাড়া অন্যান্য যোজনাতেও পরিস্থিতি সমান সর্বনাশা। যেমন, বিপর্যয় মোকাবিলা খাতে পশ্চিমবঙ্গের বকেয়া প্রায় সাড়ে তিপ্পান্ন হাজার কোটি টাকা। অথচ এ ক্ষেত্রেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বৈঠকে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হল, পশ্চিমবঙ্গ রইল উপেক্ষিত।
আরও একটি প্রশ্ন। যে অর্থ কেন্দ্র এই ভাবে আটকে রাখছে, তা কি কেন্দ্রীয় শাসকের দান বা ভিক্ষা? না কি, তা জনগণের জন্য ব্যয়েরই অর্থ? গণতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতে সেই অর্থ কি সম ভাবে সব রাজ্যের ‘প্রাপ্য’ হওয়ার কথা নয়? বিরোধীশাসিত রাজ্যের সঙ্গে কেন্দ্রের রেষারেষি বা তর্কাতর্কি এ দেশে নতুন নয়। কিন্তু রাজনৈতিক কুস্তিপ্যাঁচে বিরোধী রাজ্যের জনসমাজকে বছরের পর বছর বঞ্চিত রেখে সেখানকার শাসকের উপর চাপ তৈরি, এবং রাজ্যের জননির্বাচিত প্রতিনিধিদের অবজ্ঞার এই পন্থা— এক অদৃষ্টপূর্ব অন্যায়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)