E-Paper

উচ্চ-অশিক্ষা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যাচর্চার জায়গা, ধর্মচর্চার নয়— এই সহজ সত্যের যুক্তিটি দেখালে অবশ্য আজকের ভারতে, এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও ইদানীং এই প্রতিযুক্তি তেড়ে আসে: ক্যাম্পাসে সরস্বতী পুজো হতে পারলে অন্য দেবতাদের পুজো হবে না কেন।

শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৭

পথপ্রান্তে থাকা তীর্থের গরিমা নয়, পথের দু’ধারে ‘দেবালয়’-এর সহজ উপস্থিতি অনুভব করেছিলেন কবি। এ-কালের পশ্চিমবঙ্গে, আইআইএম কলকাতা-র মতো উচ্চমার্গীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাতারাতি হনুমান মন্দির প্রতিষ্ঠা ও পূজার্চনার রমরমা দেখে তাঁর কী প্রতিক্রিয়া হত, তা আজ জানার উপায় নেই। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া বরং লক্ষণীয়। খোদ ডিরেক্টর জানিয়েছেন, মন্দির প্রতিষ্ঠা ও পূজার্চনার ‘ঘটনা’র সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা কর্তৃপক্ষ জড়িয়ে আছেন তা যেমন তাঁরা বলছেন না, তেমনই এ ঘটনা থেকে নিজেদের সরিয়েও নিচ্ছেন না। প্রতিষ্ঠানের অর্থব্যয় হয়নি, ছাত্ররা নিজেরাই টাকাপয়সা জোগাড় করে যা করার করেছে, অতএব তা প্রতিষ্ঠানের মাথাব্যথা নয়, ভাবখানা এমন। নিহিতার্থ অবশ্য প্রণিধানযোগ্য: রামনবমীর দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজেই খোদ ডিরেক্টর যখন শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, তখন হনুমান জয়ন্তীতে মন্দির গড়ে পুজো-পাঠ আর অভিনন্দনযোগ্য হবে না কেন!

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যাচর্চার জায়গা, ধর্মচর্চার নয়— এই সহজ সত্যের যুক্তিটি দেখালে অবশ্য আজকের ভারতে, এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও ইদানীং এই প্রতিযুক্তি তেড়ে আসে: ক্যাম্পাসে সরস্বতী পুজো হতে পারলে অন্য দেবতাদের পুজো হবে না কেন। সরস্বতী জ্ঞান ও বিদ্যাচর্চার অধিষ্ঠাত্রী বলেই বিদ্যায়তনে তাঁর আরাধনার চল, এ-কথা বলার পাশাপাশি সারস্বত মহলেই প্রচলিত এই যুক্তিটিও এ ক্ষেত্রে বলার: বিশ্ববিদ্যালয় বা সমগোত্রীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি মুক্ত উদার সর্বমতের ধাত্রীভূমি বলেই সেখানে কোনও ধর্মানুষ্ঠানেরই প্রয়োজন নেই, সেখানে শুধু হওয়া দরকার যে কোনও রকম ধর্ম-অনুষঙ্গরহিত উচ্চচিন্তা-চর্চা। আজ কিছু ছাত্র নিজেরাই টাকাপয়সা জোগাড় করে ক্যাম্পাসে হনুমান মন্দির বানিয়েছে বলে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তা নিয়ে মাথাব্যথা না থাকে, আগামী কাল অন্য ছাত্রেরা একই ক্যাম্পাসে মসজিদ বা গির্জা তৈরি করলে কর্তৃপক্ষ তা সমর্থন করবেন কি? অতঃপর কি এ-ই হতে থাকবে, পড়াশোনা ছেড়ে ক্যাম্পাসে দেবালয়-উপাসনালয় গড়ার রাজনীতি? তারই তর্জন-গর্জন, পেশি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা— ঠিক যেমনটা চলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে রাস্তায়, সমাজেও?

কেন্দ্রে শাসক দল বিজেপির ধর্ম তথা হিন্দুত্বের রাজনীতির প্রবল প্রতাপেরই ক্ষুদ্র নমুনা এগুলি, বুঝতে অসুবিধা হয় না। বিস্ময়, আশঙ্কা ইত্যাদির স্তর পেরিয়ে এই ঘটনাগুলি এখন আরও বেশি করে দুর্ভাগ্যের মনে হয়, তার প্রতি পদে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার, শাসকের নিষ্প্রশ্ন আনুগত্যের ছাপটি স্পষ্ট বলে। আইআইএম, আইআইটি বা সর্বভারতীয় স্তরের খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক তা ভিন্ন প্রশ্ন, তা বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে তাঁরা আপস করবেন, একটি ধর্মের চর্যাকে ক্যাম্পাসেই প্রকাশ্যে বা ঘুরপথে তোল্লাই দেবেন এবং অন্য ধর্মবিশেষকে দুয়ো— এই দ্বিচারিতা অপরাধের শামিল। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা-প্রকল্প, সেমিনার ইত্যাদির নামে অশিক্ষা চাষের উদাহরণ সম্প্রতি ভূরি ভূরি, এ বার কি ক্যাম্পাসে পুজো-যজ্ঞেরও অবাধ অনুমতি মিলবে? ভারতীয় উচ্চ-অশিক্ষার বিদ্যায়তনিক পাঠক্রমও চালু হল বলে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Hanuman Jayanti Hanuman Puja IIM Joka Education system

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy