E-Paper

আসল কথা

শহর পরিষ্কার রাখা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম পদক্ষেপ হিসাবে এই নিয়ম হলে সে যুক্তি তবু সঙ্গত; খোলা জায়গায় মাংস কেন, যে কোনও পচনশীল খাদ্যবস্তুর বিক্রিবাটাই নানা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং করেও।

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:১১

উত্তরপ্রদেশের পথেই বিহারও হাঁটছে কি না, এই ধন্দ ও প্রশ্ন এই মুহূর্তে অসঙ্গত নয়। যত্রতত্র প্রকাশ্যে, রাস্তার পাশে বা খোলা জায়গায় মাংস বিক্রি করা যাবে না, শুধু লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিক্রেতাদেরই নির্দিষ্ট জায়গায় মাংস বিক্রির অনুমতি থাকবে— বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রীর মুখে সম্প্রতি এই নতুন নিয়মের ঘোষণা আরও স্পষ্ট ও তার ব্যাখ্যা আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন ছিল, কারণ নিয়মটি শুধু বিহারের পুরসভা এলাকায় প্রযোজ্য হওয়ার কথা। শহর পরিষ্কার রাখা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম পদক্ষেপ হিসাবে এই নিয়ম হলে সে যুক্তি তবু সঙ্গত; খোলা জায়গায় মাংস কেন, যে কোনও পচনশীল খাদ্যবস্তুর বিক্রিবাটাই নানা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং করেও: তাতে দৃশ্যদূষণ ঘটে, জায়গাটি নোংরা হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায়, আবর্জনা জমে নর্দমা বন্ধ হয়, সর্বোপরি খোলা জায়গায় বিক্রি হওয়া মাংস মাছি ও ব্যাক্টিরিয়ার চারণভূমি— আবহাওয়া-ভেদে তার পরিণাম মারাত্মক হতে পারে। এগুলিই যদি সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণ হত, তবে তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলাও প্রশাসনেরই কর্তব্য ছিল।

সরকারি স্পষ্টতার অভাবে এই রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হল, বিহারে মাংস বিক্রিতে রাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। যে রাজ্যের একটা বড় অংশের খাদ্যাভ্যাসে আমিষের স্থান, প্রতি বছর যে রাজ্যে প্রায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার টন মাংস ও প্রায় ১০ লক্ষ টন মাছ উৎপাদন হয়, সেখানে এর বিক্রিবাটা সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার সুচিন্তিত। তদুপরি মনে রাখা দরকার, বিহারে মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলের বাসিন্দা, সিংহভাগই বসবাস করেন গ্রামে, এবং মাছ-মাংস’সহ নিত্যপণ্যের খুচরো তথা অসংগঠিত বিক্রেতাদের একটা বিরাট অংশ নিত্য গ্রাম থেকে শহরে যাতায়াত করেন। লাইসেন্সধারী বিক্রেতার সংখ্যা এঁদের পাশে স্পষ্টতই নগণ্য। হঠাৎ করে চালু হওয়া সরকারি নিয়মে কেনাবেচার এই গোটা প্রক্রিয়াটিই ব্যাহত হবে, এমনকি পরিবহণও— বিজেপি-শাসিত ভারতে বাণিজ্যিক যানবাহনে মাংস নিয়ে যাওয়ার ‘অপরাধ’-এও সাধারণ বিক্রেতা তথা মানুষের হেনস্থার ঘটনা অগুনতি। বিহার সরকারের অস্পষ্ট ঘোষণায় এই ঝুঁকি আরও বাড়বে। অন্য দিকে, পুর-এলাকা পরিষ্কার, স্বাস্থ্যকর রাখার লক্ষ্যপূরণ কঠিন কিছু নয়: পুরসভা ধরে ধরে মাংস বিক্রির লাইসেন্স-প্রক্রিয়া, বিক্রয়স্থান ও তার পরিকাঠামোয় নজর দেওয়া চাই।

এহ বাহ্য। প্রকাশ্যে মাংস বিক্রি নিষেধ, এ কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী এও বলেছেন, কারও ভাবনায় আঘাত দেওয়া চলবে না। পুর-স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের রক্ষাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে হঠাৎ ভাবনা তথা ভাবাবেগে আঘাতের কথা উঠল কেন? উত্তরপ্রদেশ ও বিজেপি-শাসিত অন্য অনেক রাজ্যের মতোই বিহারের এই সরকারি সিদ্ধান্তটিও শেষাবধি বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে বেসাতি, এটাই কি তবে বুঝতে হবে? নতুন সরকারি নিয়মের সঙ্গে যদি আমিষ-নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসের প্রশ্ন, বা কোনও বিশেষ ধর্মের দিকে ঠারেঠোরে ইঙ্গিতও না-ই থাকে, তা হলে কারও ভাবাবেগে আঘাত লাগল কি না তাতে সরকারের কী আসে যায়? আবহমান কাল চলে আসা জন-খাদ্যাভ্যাস ও তার দৃশ্যমান বাস্তব যদি আজকের জমানায় কারও ভাবাবেগ আহত করে, তা সেই ভাবাবেগের সমস্যা। রাজনৈতিক দলগুলি বরং অব্যবস্থায় ভরা নাগরিকজীবন উন্নত করার দিকে মন দিক, যত দিন অন্তত শাসনক্ষমতায় আছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bihar Uttar Pradesh Non veg foods

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy