অসমের চা বাগানে মজুরি বাড়ল, পশ্চিমবঙ্গে কেন বাড়ল না, এই প্রশ্নে উত্তরবঙ্গের নির্বাচনী প্রচার সরগরম হতে চলেছে। সম্প্রতি অসমে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি তিরিশ টাকা বাড়িয়ে ২৮০ টাকা করা হয়েছে, বরাক উপত্যকায় মজুরি ২৫৮ টাকা। কেরলের বাম সরকারও মজুরি বাড়িয়েছে, ৪৯৮ টাকা থেকে ৫৪৬ টাকা। পশ্চিমবঙ্গে গত দু’বছর ন্যূনতম মজুরি আটকে রয়েছে ২৫০ টাকায়। নির্বাচন ঘোষণা হয়ে গিয়েছে, ফলে এখন আর বাড়তি বেতন ঘোষণা করা যাবে না। তার উপর বেশ কিছু বাগানে কয়েক মাস বেতন বকেয়া রয়ে গিয়েছে, তাই নিয়ে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। বারোটি বিধানসভা ক্ষেত্রে চা বাগানের শ্রমিকদের ভোট নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়, তাই বিষয়টি কেবল শ্রমিক সঙ্কটে আটকে না-থেকে রাজনৈতিক প্রশ্নও হয়ে উঠছে। তৃণমূল চা বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা এর উত্তরে মনে করিয়েছেন তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশ্বাস। এ বছর ৩ জানুয়ারি আলিপুরদুয়ারে অভিষেক বলেছিলেন, তৃণমূল ফের সরকার গঠন করলে চা মজুরদের দৈনিক মজুরি তিনশো টাকা করা হবে। এই প্রতিশ্রুতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দেয়। প্রথমত, অনুদান, ভাতা, জমি বা আবাসন দান, এমন কিছু কিছু সামাজিক সুরক্ষা সরকারের বিবেচনাধীন। সরকার চাইলে তা দিতে পারে, আবার না চাইলে চালু প্রকল্প বন্ধও করতে পারে। কিন্তু বেতন সরকারের ইচ্ছাধীন নয়। যে কোনও কাজে বেতনের কাঠামো নির্দিষ্ট করার রূপরেখা রয়েছে। সেই অনুসারে বেতন ঘোষণা করতে সরকার বাধ্য। বেতনের বৃদ্ধি কখনওই রাজনৈতিক দলকে জেতানোর ‘পুরস্কার’ হিসেবে তুলে ধরা চলে না।
দ্বিতীয়ত, তৃণমূল সরকার চা শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন স্থির করার কমিটি তৈরি করেছিল ২০১৫ সালে। সে সময়ে শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, কমিটির মেয়াদ দু’বছর, তবে তিন মাসের মধ্যেই ন্যূনতম বেতন ঘোষণা হতে পারে। তার পর এক দশক কেটে গিয়েছে, ওই কমিটি অন্তত কুড়ি বার বৈঠক করেছে, কিন্তু ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা হয়নি। পাশাপাশি প্রশ্ন ওঠে কেন্দ্রীয় বরাদ্দের অব্যবহার নিয়েও। অসম ও পশ্চিমবঙ্গের চা শ্রমিকদের জন্য হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল কেন্দ্র (প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক প্রোৎসাহন যোজনা, ২০২১-২২)। অসম তার বরাদ্দের অনেকখানি খরচ করলেও, পশ্চিমবঙ্গ সে টাকা খরচে উদ্যোগ করেনি। অন্তত তিনশো কোটি টাকা রয়ে গিয়েছে দরিদ্র নারী-শ্রমিকদের নাগালের বাইরে। বকেয়া মজুরি আদায়ের বিষয়টিতেও রাজ্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রাপ্য টাকা ফাঁকি দেওয়া তো ফৌজদারি আইনের অধীনে পড়ে— আইন প্রয়োগ করে বকেয়া টাকা আদায় করতেই পারে সরকার। অথচ, বকেয়া আদায়ের জন্য অনশনে বসতেও বাধ্য হচ্ছেন শ্রমিকরা। দরিদ্র মহিলাদের বেতন থেকে টাকা কেটেও পিএফ না দেওয়া, বেতন বকেয়া রেখে বাগান বন্ধ করে দেওয়া, স্বল্পমেয়াদি ভিত্তিতে বাগান খুলে ন্যূনতম মজুরির কমে কাজ করতে বাধ্য করা, এগুলি উত্তরবঙ্গের চা বাগানে প্রচলিত কৌশল।
শ্রমিকের এই সঙ্কটকে চা শিল্পের সঙ্কট থেকে আলাদা করে দেখা চলে না। শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশের চায়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে যে ধরনের বিনিয়োগ করার প্রয়োজন দার্জিলিং এবং তরাইয়ের চা বাগানে, তা করা হয়নি। নিলামে চায়ের দামে পতন, উৎপাদনের খরচে বৃদ্ধি প্রভৃতি সামাল দিতে শিল্প সংস্থাগুলি কেবলই ঝুঁকছে শ্রমিকের খরচ কমানোর দিকে। বাগিচা শ্রমিক আইন (১৯৫১) অনুসারে শ্রমিকদের প্রাপ্য অতীতের সুযোগ-সুবিধাগুলি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ বেশি হচ্ছে, বেতন বাড়ানো হচ্ছে না। শিল্প ও শ্রমিক, উভয়ই সঙ্কটাপন্ন। শূন্য প্রতিশ্রুতির বদলে চা শিল্প নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করলে হয় না?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)