এক বছর আগে, ক্ষমতাশীর্ষে দ্বিতীয় বারের জন্য আরোহণ করেই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন মেক্সিকো উপসাগরের নাম পাল্টে আমেরিকান উপসাগর করে দিয়েছিলেন, তখন বিশ্বদুনিয়া বিষয়টিকে হাস্যকর ভেবেছিল। এত দিনে হয়তো বিশ্বনাগরিকরা উপলব্ধি করছেন, কেন বিষয়টি নিছক হাসির ছিল না। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে ট্রাম্পের আকাশবাহিত বাহিনী গিয়ে ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে যে ভাবে প্রাসাদ থেকে বন্দি করে সোজা নিয়ে এল আমেরিকার মাটিতে, তা কোনও কল্পকাহিনি কিংবা সস্তা রাজনৈতিক থ্রিলার নয়, দস্তুরমতো বাস্তব, সুপরিকল্পিত, যত্নসহকারে সংঘটিত। এই ভাবেই রচিত হচ্ছে একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের বিশ্ব-কূটনীতি। সমস্ত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে সোজা অন্য দেশের অন্দরে ঢুকে প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়ার এই পদ্ধতি প্রমাণ করে দিল— আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র মহাসমারোহে সামরিক কর্তৃত্ববাদে ফিরে গিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিয়মাবলির মান্যতা ইত্যাদি সমূলে উৎপাটিত ওয়াশিংটন ডিসির বিশ্ববীক্ষা থেকে।
এমন ঘটনার সংঘটকরা কোনও অজুহাতের ধার ধারেন না। তবু ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে এই যুক্তি যে— ভেনেজ়ুয়েলার উপর এই আক্রমণ নার্কো-টেররিজ়ম বা মাদক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধেরই জরুরি অংশ। অজুহাত হিসাবেও কথাটি জুতসই নয়। আমেরিকায় ড্রাগ-পাচারের ক্ষেত্রে ভেনেজ়ুয়েলার ভূমিকা নতুন কিছু নয়, অকস্মাৎ এমন পদক্ষেপ তাই এই যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা মুশকিল। শোনা যাচ্ছে ভেনেজ়ুয়েলার গণতন্ত্রের ব্যর্থতার কথাও। বাকি দুনিয়া নিশ্চয়ই ভাবছে আমেরিকা নিজের গণতন্ত্রের হাল নিয়ে না ভেবে কেন ভেনেজ়ুয়েলার নৈতিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ে এত ব্যথিত ও বিপন্ন। মাদুরো নাকি সে দেশে নির্বাচন চুরি করেছেন, অর্থাৎ অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা কব্জা করেছেন। এই অভিযোগের সত্যাসত্য নির্ণয়ের দরকার নেই, বিশেষত যখন ট্রাম্পের নিজ মুখেই গণতন্ত্র ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার অসারতার কথা শুনে ফেলেছেন বিশ্ববাসী। বস্তুত, এ বারের কারাকাস অভিযানে ট্রাম্পের নিজস্ব শৈলীর স্বাক্ষর থাকতেই পারে, কিন্তু গণতন্ত্রের অপ্রতুলতার অজুহাতে ভিন দেশে মার্কিন নাসিকাক্ষেপণের রোগটির সঙ্গে কি বিশ-একুশ শতকের দুনিয়া বিলক্ষণ পরিচিত নয়? একের পর এক দেশে এই যুক্তিতে মার্কিন সেনা অবতরণের ধামাকা দেখা গিয়েছে, নিকারাগুয়া ইরাক আফগানিস্তান ইউক্রেন ভেনেজ়ুয়েলা।
সুতরাং আমেরিকার কার্যক্রমে আকস্মিকতার চমক থাকলেও প্রকৃত অর্থে বিস্ময়ের কিছু নেই। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার খনিজ তেল কব্জা করার প্রকল্পটিও বহুকাল যাবৎ হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের নীতি প্রণয়নে প্রথম ও প্রধান শর্ত। তেল-সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা তার নিজস্ব হালকা ঘনত্বের ‘লাইট ক্রুড’-এর পাশে খনিজ-ঘন তৈল বা ‘হেভি ক্রুড’ সংগ্রহে অতি ব্যগ্র— যার বিরাট সম্ভার ভেনেজ়ুয়েলার মতো দেশে। অর্থাৎ আমেরিকার এই প্রকল্প অনেক দিনের, এই সামরিক হস্তক্ষেপের নির্লজ্জ নীতিও বহু দিনের। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখানে কোনও পথপ্রদর্শক নন, বরং অন্যতম চরিত্র মাত্র। ইতিহাস যখন প্রহসনে পরিণত হয়, প্রহসনের মোড়কেই ইতিহাস রচিত হতে থাকে। ভেনেজ়ুয়েলার উপর আক্রমণকে তাই ট্রাম্প ও তাঁর বহুবিধ হাস্যকর কার্যকলাপের অংশ হিসাবে দেখা ভুল হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিতান্ত সীমিত, প্রত্যাশিত ভাবেই। রাষ্ট্রপুঞ্জ যে হেতু সম্পূর্ণ আমেরিকার প্রভাব-অধ্যুষিত, সেখান থেকে বিরোধিতা বা সমালোচনার আশা শূন্য। আবার, দ্বিপাক্ষিত সম্পর্কের সাম্প্রতিক রসায়নে, আমেরিকা বা চিনের মতো দেশ নিজ নিজ বলয়ে শক্তিপ্রদর্শন করলে অন্য দেশ হস্তক্ষেপ করে না। চিন ভেনেজ়ুয়েলায় নাক না গলালে আমেরিকাও তাইওয়ান নীরব দর্শক থাকবে: বোঝাপড়া এই মাত্র। মাদুরো পর্ব এই বাস্তবকে আবারও স্পষ্ট করে দিল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)