E-Paper

কে বড় শত্রু

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রকৃতির নিয়মই এই— যত বড় দুর্যোগই ঘটুক না কেন, একটু একটু করে সে নিজের ক্ষত কেবল সারিয়েই তোলে না, শূন্যস্থান পূরণ করারও অধিক কিছু করে, প্রাণের অবাধ বিস্তার ঘটিয়ে চলে।

শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:১৪

জনস্মৃতি বড়ই ক্ষণস্থায়ী, বলে লোকে। আবার সুখস্মৃতি মিলিয়ে যায় দ্রুত, যে স্মৃতিগুলি অসহ্য বা দুঃসহ সেগুলি বরং মনে থাকে বেশি, এ কথাও চালু। এ কারণেই ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা-খরার মতো ভয়াবহ দুর্যোগগুলির স্মৃতিসূত্রে সাধারণ মানুষ অনেক সময় অতীতের হিসাব করেন— কিংবা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্বিপাক যেমন যুদ্ধ, দাঙ্গা, সংঘর্ষ বা অন্য দুর্ঘটন-অঘটনের সূত্রে। এমনই এক ভয়ঙ্কর মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের চল্লিশ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল চেরনোবিল নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের একটি রিয়্যাক্টরে বিস্ফোরণের জেরে অচিরেই ছড়িয়ে পড়ে ভয়ঙ্কর বিকিরণ। ক্রমে জানা যায়, চেরনোবিল ও কাছে-দূরের এলাকা তো বটেই, তৎকালীন সোভিয়েট ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অঞ্চল-সহ ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়েছে তা। সংলগ্ন অঞ্চলকে ‘এক্সক্লুশন জ়োন’ ঘোষণা করে ১ লক্ষ ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বিকিরণ-বিষে তৎক্ষণাৎ মারা যান ইঞ্জিনিয়ার, প্লান্ট-কর্মী, অগ্নি নির্বাপণ কর্মী-সহ অনেকে; অ্যাকিউট রেডিয়েশন সিনড্রোম (এডিএস) নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেরই মৃত্যু হয় পরের কয়েক মাস থেকে এক দশকের মধ্যে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হিরোশিমা-নাগাসাকির স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছিল চেরনোবিল— থাইরয়েড ক্যানসার থেকে শুরু করে তেজস্ক্রিয়তা-জনিত নানা মারণ রোগের শিকার হন বহু মানুষ।

চল্লিশ বছর খুব বড় সময় নয়। এর মধ্যে ২০১১-য় জাপানে ফুকুশিমা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টে মহাবিপর্যয় ঘটেছে, তাতেও চেরনোবিলের স্মৃতি ম্লান হয়নি। সোভিয়েট ইউনিয়ন আজ অতীত, চেরনোবিলের অবস্থান বর্তমান ইউক্রেনে এবং রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধ চলছে— এই পাল্টে যাওয়া প্রেক্ষাপটেও চেরনোবিল এক বিস্ময়ভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৬০০ বর্গকিমি জুড়ে ঘোষিত ‘চেরনোবিল এক্সক্লুশন জ়োন’ (সিইজ়েড), যা গত চার দশক ধরে জনশূন্য, আজও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের সুবাদে যেখানে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ বা অতিনিয়ন্ত্রিত, সেখানেই দেখা যাচ্ছে প্রকৃতি ও প্রাণের নতুন উদ্ভাস— জানাচ্ছেন বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। মানুষের পা যেখানে আর পড়ছে না, সেখানে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণ পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছে এতটাই যে, চল্লিশ বছর পর আজ চেরনোবিল হয়ে উঠেছে এক অপরিকল্পিত, স্বতঃস্ফূর্ত অভয়ারণ্য, পুনর্বন্যকরণ বা ‘রিওয়াইল্ডিং’-এর গবেষণাগার। চেরনোবিলে নেকড়ে, শেয়াল, ইউরেশিয়ান লিংক্স, বুনো শুয়োর, এল্ক-এর মতো প্রাণীর সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে; ফিরে এসেছে ব্রাউন বেয়ার ও ইউরোপিয়ান বাইসন, ব্ল্যাক ও হোয়াইট স্টর্ক, হোয়াইট-টেলড ইগলের মতো পাখিরা; এমনকি বিশ্ব জুড়ে বিপন্ন এমন পাখি, বিপন্ন প্রাণী-প্রজাতিও। উচ্চ তেজস্ক্রিয় বিকিরণে কাছাকাছি ১০ বর্গকিমি এলাকার পাইনগাছেরা মরে গিয়েছিল, তাদের রং হয়ে গিয়েছিল রক্তাভ বাদামি; কিন্তু এখন সেই অঞ্চলেই দেখা যাচ্ছে উদ্ভিদবিস্তার ও বৈচিত্র, প্রকৃতি যেন নিজেই নিজের উপশম ও প্রতিকার দুই-ই হয়ে উঠেছে।

প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণের এই প্রত্যাবর্তন ও প্রসার অভিভূত করার মতো এক ঘটনা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রকৃতির নিয়মই এই— যত বড় দুর্যোগই ঘটুক না কেন, একটু একটু করে সে নিজের ক্ষত কেবল সারিয়েই তোলে না, শূন্যস্থান পূরণ করারও অধিক কিছু করে, প্রাণের অবাধ বিস্তার ঘটিয়ে চলে। সাধারণ মানবমনে এ হয়তো ‘মিরাকল’-প্রতিম, কিন্তু প্রকৃতি ও জীবন-বিজ্ঞানের বিশ্লেষণে এই সবই ব্যাখ্যাযোগ্য: বিশেষজ্ঞরা চেরনোবিলের প্রাণ-প্রকৃতি খতিয়ে দেখে জানাচ্ছেন কী ভাবে ‘ট্রি-ফ্রগ’-এর মতো কোনও কোনও প্রাণীর গাত্রবর্ণ হয়ে উঠেছে গাঢ়, কিংবা খাস রিয়্যাক্টরের মধ্যে গজিয়ে ওঠা ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’ও মেলানিনের ঘনত্বকে অস্ত্র করে তেজস্ক্রিয় ও ইউভি রশ্মি বিকিরণের সঙ্গে যুঝছে; কিছু উদ্ভিদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ডিএনএ মেরামতের আশ্চর্য কলাকৌশল— ক্ষতিকর বিকিরণ সামলে উত্তরণের জয়গান যেন। কিন্তু সব কিছুর পরেও বিজ্ঞানীদের মতামত, এই সব কিছুই সম্ভব হয়েছে একটি অপ্রিয় কিন্তু অমোঘ সত্যের কারণে: মানুষের অনুপস্থিতি। মানুষ আর শিকারে আসছে না, কৃষিকাজ করছে না, বন কেটে বসত গড়ছে না, এমনকি তার পা পর্যন্ত পড়ছে না— এই কারণেই প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণ নির্ভয়ে জীবন বিস্তার করছে আজকের চেরনোবিলে। এ জিনিস কোভিডকালে লকডাউনেও দেখা গিয়েছিল, মানুষের সংস্রবহীন প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণ হয়ে উঠেছিল নির্ভয়। মানুষই যে ভয়ঙ্করতর শত্রু, এমনকি তেজস্ক্রিয়তার চেয়েও— দেখিয়ে দিচ্ছে চেরনোবিল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Chernobyl Disaster Chernobyl Ukraine Disaster

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy