E-Paper

অসম-যুদ্ধ

খেরোনি-ফেলাংপি বাজার অঞ্চল থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ পরিসরে বাড়িঘর দোকানপাট ভেঙে, লুটপাট করে, মানুষ ‘খেদানো’, এমনকি পুলিশ ‘পেটানো’ চলছে।

শেষ আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৮

ভারতের মূল ভূখণ্ডের এক বিরাট অংশ জুড়ে যখন ‘বাঙালি মানে বাংলাদেশি’ সন্দেহে অত্যাচার-নির্যাতন চলছে, তখনই নতুন অশান্তি-সঙ্কটে গ্রস্ত হয়েছে অসম। প্রত্যহ ভয়ঙ্কর হিংসার ঘটনা ঘটে চলেছে, কখনও নিধন, কখনও অগ্নিসংযোগ। বাস্তবিক, অসমে পশ্চিম কার্বি আংলং-এর জনজাতি-অধ্যুষিত পরিসরে গত মাসাধিক কাল ধরে যা চলছে, তা এখনও ভারতের অন্যত্র প্রচারমাধ্যমের মূল নজরের বাইরে থাকলেও তার গুরুত্ব বিরাট। বহিরাগত-ভূমিপুত্র, জনজাতি-উচ্চজাতি, বাঙালি-অবাঙালি, হিন্দু-মুসলমান— বহু মাত্রায় চলমান এই সত্তাসংঘর্ষ কার্যত ভারতীয় পরিচিতিটিকেই ক্রমশ বিপন্ন করে তুলেছে। ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী, এই সুরক্ষিত অঞ্চলে বহিরাগত, এমনকি আঞ্চলিক মানুষও, সহজে জমি কেনা-বেচা করতে পারেন না। অথচ অভিযোগ এই যে, গত কয়েক বছর ধরে বহু ‘বহিরাগত’ এখানে জমি দখল করে বসবাস করছে, এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশ্রয়ে সেই জমির দখলকে সরকারি সিলমোহর দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। প্রতিবাদে উত্তাল জনজাতিভুক্ত সমাজ। প্রতিবাদীরা টানা দুই সপ্তাহের বেশি অনশনে বসেও ফল পাননি। অভিযোগ, পুলিশ উল্টে প্রতিবাদীদেরই গ্রেফতার করছে। জনজাতি গোষ্ঠীগুলি এখন প্রশাসনের উপর নির্ভর না করে, আইনশৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে, নিজেরাই ‘বহিরাগত’ উচ্ছেদ প্রকল্পে অবতীর্ণ। খেরোনি-ফেলাংপি বাজার অঞ্চল থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ পরিসরে বাড়িঘর দোকানপাট ভেঙে, লুটপাট করে, মানুষ ‘খেদানো’, এমনকি পুলিশ ‘পেটানো’ চলছে। এক বাঙালিও নিহত হয়েছেন, সংবাদ। দু’টি জেলায় কার্ফু জারি ও মোবাইলের ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের পরও পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোটের উপরে ব্যর্থ হিমন্তবিশ্ব শর্মার সরকার।

ষষ্ঠ তফসিলে জনজাতিভুক্তদের যে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, আপাতত সেটাই সংঘর্ষের মূল উৎসবিন্দু। জনজাতি গোষ্ঠীর দাবি, সাংবিধানিক ভিত্তিতেই এই অঞ্চলে কোনও বহিরাগত জনবসতি তৈরি ও জমি দখল চলতে পারে না, বিস্তীর্ণ পশুপালন এলাকা এর ফলে তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে, স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সমাজ-সংস্কৃতি বিপন্ন হচ্ছে। কার্বি আংলং স্বশাসিত কাউন্সিল এখন সেই জনজাতিভুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধেও খড়্গহস্ত, যাঁরা বিজেপি সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন, কিংবা আপস-রফায় নিয়োজিত আছেন। নতুন বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে যাঁরা মুসলমান তাঁদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি সন্দেহ ও অভিযোগ তীব্রতর। তবে অমুসলমানরাও একই ভাবে বিপন্ন, বিহারি তথা বহিরাগত সন্দেহে তাঁদের প্রতিও জনক্ষোভ ধাবিত। বিপরীতে বসতিকারীদের বক্তব্য, ইতিমধ্যেই অনেক বছর তাঁরা এই অঞ্চলে বসবাসকারী, সুতরাং নাগরিক অধিকার, এবং তৎসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার তাঁদের প্রাপ্য। উল্টে বরং কার্বিদের বিরুদ্ধেই বিদেশি স্লোগান তুলছেন তাঁরা, ‘কার্বি-চিনা গো ব্যাক’ ধ্বনি-সহ।

অভিযোগ, বিজেপি সরকার জনজাতি গোষ্ঠীগুলিকে দীর্ঘ দিন ধরে প্রান্তিকায়িত করেছে বলেই আজ পরিস্থিতি এত অগ্নিগর্ভ। এখানেই প্রশ্নটি বৃহত্তর মাত্রা পায়। অসমের সত্তারাজনীতির সংঘর্ষের ইতিহাস নতুন নয়, কিন্তু বাঙালি বনাম অসমিয়া দ্বন্দ্ব কিংবা ‘মিয়া’ বা বাঙালি মুসলমান বনাম অসমিয়া দ্বন্দ্ব পরিচিত হলেও বহিরাগত ভারতীয় বনাম স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের এই তীব্রতা নতুন। শাসনাসীন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ‘এক দেশ এক সংস্কৃতি’র চাপ যে এর পিছনে বহুলাংশে দায়ী, সন্দেহ নেই। অসমের রাজনীতির এই হিংসাত্মক চেহারা তাই ভারতের সমগ্র ভূখণ্ডের জন্য জরুরি বার্তা বহন করছে। শুধু হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নই তো নয়, ভারতের বৈচিত্রের প্রশ্নটি জাতভিন্নতা, জনজাতি বিভিন্নতাও তুলে ধরে। বহুসংস্কৃতিবিশিষ্ট এই দেশভূমিতে দেশাধিকারের প্রশ্নে ক্রমাগত অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ, বিরোধ ভারতকে নতুনতর বিপন্নতায় নিক্ষেপ করছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Assam

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy