বাবরি মসজিদ ধংসের ঘটনার পর থেকে আমাদের দেশ বদলে গিয়েছে চিরদিনের মতো। সেই কয়েক বছরে দেশ জুড়ে হানাহানির এত ঘটনা ঘটে যে সেই বদলটাকে মেরামত তো করাই যায়নি বরং তা আরও বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে ভয়ানক আক্রান্ত হল ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্র। বিপজ্জনক ভাবে বাড়ল সাম্প্রদায়িক বিভাজন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মদতে পুষ্ট বাহিনী গোরক্ষার নামে কিংবা নীতি-পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দলিত ও মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। সংবিধানের অলঙ্ঘনীয় গণতান্ত্রিক অধিকারগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো ছেঁটে ফেলা দিনে দিনে বেড়েছে। দলিত ও মুসলিমদের উপর হামলা, বনাঞ্চলের অধিকার আইন থেকে আদিবাসীদের বঞ্চিত করা, তফসিলি জাতি ও জনজাতি আইন লঘু করার মতো ঘটনাগুলো ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে। সামান্য মুসলমানি অনুষঙ্গ আছে এমন শহর বা রাজ্যের নাম বদলে ফেলা হয়েছে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে। 

আর পশ্চিমবঙ্গে? গত সত্তর বছরে এ রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী দল প্রায় কিছুই করে উঠতে পারেনি। তাতেও কি বদল থেমে থেকেছে? পশ্চিমবঙ্গকে আমরা নানা সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একমাত্র নজির ইত্যাদি বলে শ্লাঘা বোধ করেছি, কিন্তু অবস্থাটা ঠিক কী ভাবে বদলে যাচ্ছে সে দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখিনি। শাসক দলের ঢক্কানিনাদের মধ্যে খোঁজ রাখিনি এখানে মুসলমানরা ঠিক কেমন আছেন, শ্রীরাম বাহিনী বনাম সেকুলারিজ়মের নামে ধর্মাশ্রিত রাজনীতির গাড্ডায় তলিয়ে যাওয়া শাসক দলের ঠোকাঠুকি সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের পরিসরগুলো কতটা বেহাল হয়েছে। রাজ্যে হিন্দু মৌলবাদের বাড়বাড়ন্তে গ্রাম্য কাঠমোল্লা আর ওয়াহাবি-সালাফি মৌলপন্থীরা বাংলার সাধারণ মুসলমানের ঘাড়ে কতটা জেঁকে বসেছে, রাখিনি তার খবরও।

অথচ ২০১০ সালে বাম আমলের অন্তিম লগ্নে উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গায় যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল, সে আগুন এ বারও জ্বলেছে সম্প্রতি, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় নহাজারি পঞ্চায়েতের গ্রামগুলোয়। ভাটপাড়ায় বিজেপি-তৃণমূল কোন্দল সাম্প্রদায়িক মোড় নিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের নীরবতার জন্য আমরা ঘটনাগুলোকে মানুষের দুর্ভোগের ঘটনা হিসেবেও জানতে পারিনি। ভোটারদের মেরুকরণ ও বিজেপির নজিরহীন বৃদ্ধির কারণ নিশ্চয় খোঁজার চেষ্টা করবেন রাজনৈতিক পণ্ডিতরা। রাজ্য জুড়ে গত দশ বছর ধরে পড়শির সম্পর্ক যে ভাবে খারাপ হয়েছে, হিসেব কষার সময়ে সেটাও বিবেচনার মধ্যে নিতে হবে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালির মধ্যে লুকিয়ে থাকা দ্বিধান্বিত হিন্দুত্ববাদীর গোপন ডেরাটি প্রকাশ্যে এসেছে। যে বিশ্বাস কখনও ব্যালট অবধি পৌঁছতে পারেনি, সে এ বার মনস্থির করে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছেছে।  

এই ভাবনায় সে থিতু হয়েছে গত এক দশকে। সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতরের পেশ করা তথ্য থেকে জানতে পারি, ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ফি বছর এ রাজ্যে গড়ে ২০টি করে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ২০১২ এবং ২০১৩ সালে যথাক্রমে ২৩টি এবং ২৪টি ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে কম ছিল ২০১১ আর ২০১৪ সালে— ১৫ এবং ১৬টা ঘটনা। দু’বছর পরে (২০১৬) তা বেড়ে হয় ৩২। ২০১৭ সালের মে মাস পর্যন্ত ২৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। কিন্তু ওই বছর জুলাই মাসেই সাম্প্রতিক কালে রাজ্যের সবচেয়ে বড় ঘটনাটা ঘটে উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া-বসিরহাটে, ও সেপ্টেম্বরে নদিয়া জেলার নাকাশিপাড়ায়। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে অস্বীকার করে পড়শিকে আপন করতে শিখিয়েছে যে সব সহজিয়া ধর্ম, তার চর্চার আদি ক্ষেত্র জলঙ্গি নদীপাড়ের ওই গ্রামগুলো সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে রক্তাক্ত হয়েছে। তারও পরে আসানসোল-রানিগঞ্জে ভয়ঙ্কর অশান্তি ঘটতে দেখেছি।  

হিন্দু বাঙালির নবলব্ধ হিন্দুত্বের সঙ্গে মিশেছে উগ্র জাতীয়তাবাদ— সোনায় সোহাগা। এমনিতেই সে বিশ্বাস করেছে রাজ্যে মুসলমান জনসংখ্যা এমন ভাবে বাড়ছে যে কিছু দিনের মধ্যে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। বিজেপি নেতারা তাতে ইন্ধন জুগিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংখ্যালঘু নীতি এ সব ভ্রান্ত বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। মুসলমানকে সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য দরকার শিক্ষার বিস্তার আর অর্থনৈতিক মানোন্নয়ন। সেই কষ্টকর পথে না হেঁটে তিনি মুসলমানকে খুশি করার সহজ পথটাই বেছে নিয়েছেন— জেলায় জেলায় ইংরেজি মাধ্যম মাদ্রাসার বড় বড় বাড়ি বানিয়েছেন। সদিচ্ছা, অর্থের জোগান আর পরিকাঠামোর অভাবে সেগুলো কার্যত অচল। শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্তের কর্মসংস্থানের কথা না ভেবে ইমাম মুয়াজ্জিনদের ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। গড় হিন্দু বাঙালির চোখে মুসলমানের যে মিথ্যা ছবি আঁকা ছিল তা আরও পোক্ত হয়েছে। সঙ্গে ছিল বিজেপি তথা হিন্দুত্ববাদীদের লাগাতার প্রচার।

সেই প্রচার জোরদার করেছে এ রাজ্যে পাল্লা দিয়ে বাড়া আরএসএস-এর শাখা ও সহযোগী সংগঠন। আদিবাসী এবং দলিত এলাকায় একল, বনবাসী বিদ্যালয় আর সরস্বতী বিদ্যালয়ের মতো হিন্দু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে, বেড়েছে আরএসএস-এর গণভিত্তি। এ রাজ্যে লোকসভা বা বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীরা যে ভোট পেয়েছেন তার একটা বড় অংশ বামপন্থীদের ঘরের ভোট।

১৯৪৬, ’৫০, ’৬৪-র কঠিন সময়ের পরেও বাংলা স্থিত থেকেছে তার মানুষেরই জোরে। আজকের অবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা। তবুও মানুষের ওপর ভরসা রাখব। ভরসা রাখব ইতিহাসে।