আদর্শ শিক্ষক বলতে ঠিক কী বোঝায়, তা নিয়ে এই পঠনপাঠন ব্যবস্থায়, বিশেষত উচ্চশিক্ষার প্রেক্ষিতে, তা নিয়ে একটা ধন্দ কিন্তু অযাচিত ভাবে হলেও থেকেই যায়। আদর্শ শিক্ষকের সংজ্ঞা দেশের সংবিধান-সহ কোন গ্রন্থে লেখা আছে কিনা, তা জানা নেই। তবে দামাল ছেলেবেলা থেকে এটুকু মজ্জার মধ্যে ওতপ্রোত ভাবে সম্পৃক্ত করে নিয়েছি যে, শিক্ষক মানেই নমস্য ব্যক্তি, ত্রুটিবিহীন অতিমানবও বটে। আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতা, মধ্যম মেধার ধ্যানধারণা, মধ্যম পন্থী অবস্থানের উপর ভিত্তি করে শিক্ষক সম্বন্ধে এক অদৃশ্য মহামানবীয় অবয়ব সেই ‘বর্ণ পরিচয়’এর সন্ধিক্ষণ থেকেই আমাদের মননে, চেতনে, স্বপনে দৃশ্যমান করে গড়ে দেওয়া হয়েছে। সরলরৈখিক জীবনশৈলি, সহজ-সরল ব্যক্তি জীবন, সুদৃঢ় অথচ, সংবেদনশীল ব্যক্তিত্ব, শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও আদর্শ রক্ষায় অবিচল, বিলাস-বিনোদন বিমুখ জীবনপ্রবাহ এবং অবশ্যই জ্ঞান আহরণ ও ততোধিক জ্ঞান বিতরণের একমাত্র শর্তে যাঁদের জন্মগ্রহণ, বেঁচে থাকা, ইহকাল, পরকাল। 

দৃশ্যমান শিক্ষককুলের এহেন অদৃশ্যমান চিত্ররূপ আজও সমাজের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, এমন ভাবে বিস্তৃত, যাতে মনে হয় শিক্ষককুল যেন কোনও জৈবিক উপাদানে সৃষ্ট নন, শুধুমাত্র আইডিয়ায় সমৃদ্ধ! এ জগতের সত্য কি সব সময় চিরসত্য? সত্য কি আপেক্ষিক নয়? সময়, স্থান, অবস্থান, নতুন চিন্তার উন্মেষের ওপর ভিত্তি করে সত্যের সংজ্ঞা কি পরিমার্জিত হয় না? তবে অভাগা শিক্ষককুলের ক্ষেত্রে সেই মধ্যযুগীয় সত্য কেন চিরসত্য হয়ে রবে? যুগ যুগ ধরে এ কথা আমাদের মস্তিষ্কের সূক্ষ্মতম রন্ধ্রে প্রোথিত করে দেওয়া হয়েছে যে— শিক্ষকরা হল সমাজ গড়ার কারিগর। 

এ কথা অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে শিক্ষকদের প্রধান কাজই হল শিক্ষাদান। কিন্তু বর্তমান পঠনপাঠন ব্যবস্থার প্রকৃতি অনুধাবন করে বলা যায়, ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের সংস্পর্শে যতটা সময় অতিবাহিত করে, তার চেয়ে ঢের বেশি সময় কাটায় তাদের বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের সান্নিধ্যে। সমাজের এতগুলো স্তরের মানুষজনদের ঘাড়ে সমাজ গড়ার দায়ের এক-দশমাংশও না চাপিয়ে পুরো দায়টাই চাপিয়ে দেওয়া হল শিক্ষকদের ওপর। যাঁদের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরা  জীবনের এক-দশমাংশ সময়ও অতিবাহিত করে না। তবুও এ কথা স্বীকার করতেই হবে, যে সকল শিক্ষকেরা নিম্ন এবং মধ্য শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত, ছাত্রছাত্রীদের নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করার দায়বদ্ধতা ভীষণ ভাবে থেকে যায়। কিন্তু সেই দায়ভার শুধুমাত্র শিক্ষকদের ঘাড়ে চাপিয়ে অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত নাগরিকসমাজ নিজেদের দায়মুক্ত ভাববে কেন? উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা যতটা না ছাত্রছাত্রীদের নৈতিক চরিত্র গঠন করার জন্য প্রয়োজন, তার চেয়ে ঢের বেশি দায়িত্ব হল সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্বন্ধে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সম্যক ধারণা প্রতিষ্ঠা করা। তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা। বর্তমান পঠনপাঠন ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে ছাত্রছাত্রীরা মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান আহরণের তাগিদে, নৈতিক উপদেশে সমৃদ্ধ হয়ে ‘মধ্যপ্রদেশ’ বর্ধিতের উদ্দেশ্যে নয়। তা হলে যে শিক্ষক  সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গভীরতম প্রান্তে প্রবেশ করে সহজ-সরল-সাবলীল ভাষায় ছাত্রছাত্রীদের সামনে বিষয়টি উপস্থাপনা করে থাকেন, কিন্তু তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে তথাকথিত শিক্ষক জীবনের সংজ্ঞার পরিধির মধ্যে চলাফেরা করেন না, তবে কি সেই শিক্ষককে যথার্থ শিক্ষক বলা যাবে না? না কি যে শিক্ষক অনিয়মিত এবং গয়ংগচ্ছ ভাবে ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে কোনও মতে ‘দিনগত পাপক্ষয়’ করেন এবং ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা সম্বন্ধে যিনি একেবারেই উদাসীন, অথচ সামাজিক ভাবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন তথাকথিত আদর্শ শিক্ষক জীবনের পরিবৃত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তিনিই কি তা হলে আদর্শ এবং যথার্থ শিক্ষক? 

শিক্ষাদানের কাজকে যেহেতু একটি পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে, সেহেতু এক জন আদর্শ এবং যথার্থ শিক্ষকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত তিনি কতখানি পেশাদার। শিক্ষাদানের পেশার প্রতি তিনি কতটা দায়বদ্ধ, কতটা নিষ্ঠাবান, কতটা নিবেদিতপ্রাণ। শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করার জন্য যে শর্তগুলো পূরণ করে আসতে হয় বা যে সাক্ষাৎকারের মুখোমুখি হতে হয়, সেখানে শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার মান বা পরিধি সম্বন্ধে কোনও মানকসূচি বেঁধে দেওয়া থাকে না। অথচ, শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করার পর থেকেই শিক্ষকের ব্যক্তিজীবনের পরিধি সামাজিক চশমার লেন্সে অনেকাংশেই সঙ্কুচিত করে রাখা হয়। এটা কি মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি উদাহরণ নয়? এ কথা ধ্রুব সত্য যে, এই বিশ্বায়নের সূর্যালোকে আলোকিত ছাত্রছাত্রীরা মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে নিজেদের কেরিয়ার গড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে।  পরিবর্তনশীল সামাজিক পরিকাঠামোয় পরিবর্তিত ছাত্রসমাজের জীবনের লক্ষ্য যথাযথ ভাবে পরিপূর্ণ করার তাগিদে মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণায় নির্মিত তথাকথিত আদর্শ শিক্ষকের থেকে আজকের পৃথিবীতে এক জন যথার্থ পেশাদার শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি নয় কি? 

পাঠকদের যেন কখনওই এ কথা মনে না হয় যে, আমি শিক্ষকদের ব্যক্তিজীবনে স্বেচ্ছাচারিতার পক্ষে সাফাই দিচ্ছি বা শিক্ষকদের নীতি ভ্রষ্ট হতে আহ্বান করছি। আমার এই ব্যতিক্রমী বক্তব্য শিক্ষকদের ব্যক্তিজীবন এবং পেশাগত জীবনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে মিলিয়ে দিয়ে তাঁদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সঙ্কুচিত করার সামাজিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে। শিক্ষাদানের পেশার সঙ্গে যুক্ত কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিজীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতিকে ‘শিক্ষকের অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিতকরণের বিরুদ্ধে। স্খলন, পতন, ত্রুটি যেখানে সমগ্র সমাজ ব্যবস্থাকেই ক্রমেই আচ্ছাদিত করে নিচ্ছে, সে ক্ষেত্রে শিক্ষককুল এর করাল গ্রাস থেকে নিজেদের সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রাখবে কী ভাবে? আজও নাগরিকসমাজ শিক্ষকদের সেই ত্রুটিবিচ্যুতিগুলোকে সচেতন ভাবে চিহ্নিত করে আসছে শুধুমাত্র ‘শিক্ষকের বিচ্যুতি’ হিসেবেই। শিক্ষা দানের পরিপ্রেক্ষিতে বা শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষকের  ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলে তা শিক্ষকের  বিচ্যুতি হিসেবে চিহ্নিত করা যেতেই পারে। কিন্তু কোনও শিক্ষকের ব্যক্তি বা সমাজজীবনে কোন ত্রুটিবিচ্যুতি ধরা পড়লে তা শিক্ষকের  বিচ্যুতি হিসেবে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করে গোয়েবেলস কায়দায় জনসমক্ষে বারংবার তুলে ধরা কেন? 

সমাজের অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের নৈতিক স্খলনের–পতনের জন্যেও পরোক্ষ ভাবে সুকৌশলে শিক্ষকদেরই দায়ী করা হয়ে থাকে। শিক্ষকেরা যেন অমৃতধারার এই সমাজের একমাত্র গরলকুম্ভ। সমাজব্যবস্থা যদি শতসহস্র ছিদ্র বিশিষ্ট চালুনি হয়, তবে তার অন্দরের বেনোজল আটকানোর দায় কি শুধু শিক্ষকদের? সমাজের তনু-মন-প্রাণ যদি সর্বান্তকরণে কলুষিত হয়, তা নিষ্কলুষ করার দায় কেনই বা শুধু শিক্ষকদের ওপর বর্তাবে? কেন সেই দায়ভার সমাজের অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের ওপরও বর্তাবে না? সমগ্র সমাজই যেখানে মূল্যবোধ ক্ষয়িষ্ণুতায় আক্রান্ত, সেখানে শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিজীবনে স্খলন-পতন-ত্রুটি হলেই গেল গেল রব তুলে জনমানসে আপাত আতঙ্ক মুড়ে দেওয়ার চক্রান্ত শুধুমাত্র নিন্দনীয়ই নয়, ঘৃণ্যও বটে।

কিছুকাল আগে প্রকাশিত একটি বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমে একই দিনে দু’টি সমধর্মী সংবাদের ভিন্নধর্মী উপস্থাপনার উদাহরণ টানলাম। যে সংবাদমাধ্যম দুপুর দুটোর সময় ‘এক যুবকের গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা’র সংবাদ প্রকাশ করল, সেই সংবাদমাধ্যম রাত ন’টার সময়ে অন্য একটি ঘটনায় ‘এক শিক্ষকের গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা’র খবর প্রকাশ করল। মৃত ব্যক্তি যুবক হোক বা যুবতী বা বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা— সে কথা গৌণ! শিক্ষক সে যে! জীবনানন্দ বুঝি অলক্ষে মুচকি হাসলেন—“সে তো কবি নয়–অজর, অক্ষর, অধ্যাপক সে যে!” হায় রে শিক্ষক! আত্মহত্যাও তুমি শিক্ষক রূপে করলে! সমাজের গরলে জর্জরিত মানুষ রূপে নয়!  

লেখক শিক্ষক, বেলডাঙা এসআরএফ কলেজ