পশ্চিমবঙ্গের মানুষ চাল না পেয়ে সরকারকে গালমন্দ করছে, এমন খবর পেয়ে কংগ্রেস সাংসদদের একটা দল এসেছিল কলকাতায়। তার নেতা ছিলেন মুনীশ্বর দত্ত উপাধ্যায়, কংগ্রেস সংসদীয় দলের সম্পাদক। সরেজমিনে সব দেখে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, খাদ্যাভাব নেই, সরবরাহ যথেষ্ট। কী রেশন দোকানে, কী খোলা বাজারে, চালের দাম অন্য রাজ্যের তুলনায় কম, বরং পড়তির দিকে। তাঁরা রেশনের চালের ভাত খেয়ে দেখেছেন, তাকে মোটেই অখাদ্য বলা চলে না। চালে বড় কাঁকর, এই অভিযোগের উত্তরে তিনি বলেন, মধ্যপ্রদেশ থেকে আমদানি হওয়া চালে কিছু পাথর থাকা সম্ভব, কারণ পাথুরে এলাকায় তা উৎপন্ন হয়। তা বলে ইচ্ছে করে পাথর মেশানো হয়েছে, এমন বলা যায় না।

সাংবাদিক সম্মেলনের দিনটা ছিল ৩০ অগস্ট, ১৯৫৯। তার ঠিক পর দিন খাদ্যের দাবিতে কলকাতায় নানা গ্রাম থেকে এসে জড়ো হল কাতারে কাতারে মানুষ। কেউ বলে এক লক্ষ, কেউ তিন লক্ষ। ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট দিয়ে এগিয়ে আসে মিছিল, তাতে শিশু-কোলে মেয়েরাও ছিল। আশ্চর্য নয়, এর আগে খাদ্য মিছিলের যে সব ছবি উঠেছিল বসিরহাট, বাটা-নুঙ্গি, ক্যানিং এলাকায়, তাতে কাঁখে সন্তান নিয়ে ঘোমটা-টানা মেয়ের সারি। কলকাতার এই মস্ত মিছিল তো আর আন্দোলনের সূচনা নয়। জুলাই থেকে জেলায় জেলায় বিক্ষোভ শুরু হয়। ৫ অগস্ট বহরমপুরে জেলা শাসকের বাংলো ঘিরে এত লোক জড়ো হল যে তিনি পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলেন। শুরু হল পুলিশের লাঠিচার্জ, গুলি। মরল দু’টি মেয়ে, বকুল ও বন্দনা।

নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কমিউনিস্ট দলের নেতারা। আন্দাজ হয়, লোক জড়ো করতে খুব গা ঘামাতে হয়নি তাঁদের। সে বছর জানুয়ারি মাসেই বিধানসভায় সিপিআই বিধায়ক স্নেহাংশু আচার্য খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনকে বলেছিলেন, তিনি যা স্পর্শ করেন, চাল, কাপড়, কেরোসিন, সব উধাও হয়ে যায়। কথাটা মিথ্যে নয়। বিধান রায় সরকার যখনই চালের দাম বাঁধতে গিয়েছে, চালকল মালিকরা বাজার থেকে চাল সরিয়ে নিয়েছে। ১৯৫৯ সালের গোড়ায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ উঠল। চাল ফিরে এল আগুন দরে।

অগস্ট ৩১, ১৯৫৯। গ্রামের মানুষের কলকাতায় প্রবেশের পথ আটকানোর অনেক চেষ্টা করল পুলিশ। তবু সন্ধ্যা নাগাদ দেখা গেল, ময়দান থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত জনসমুদ্র। নেতাদের বক্তৃতা চলতে চলতে জোর বৃষ্টি নামল। এক জনও নড়ল না। সভা শেষে এক লক্ষেরও বেশি মানুষের মিছিল মহাকরণের দিকে এগোল। রাজভবনের কাছে পুলিশ আটকাল। স্লোগান উঠল, সস্তা দরে খাদ্য দাও, নইলে গদি ছেড়ে দাও। সাড়ে সাতটা। জনা পঞ্চাশেক নেতা-কর্মী এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে গ্রেফতার হলেন। এ-ও প্ল্যানমাফিক। এর পর কী হল? সরকারের বক্তব্য, বিশাল জনতা পুলিশ কর্ডন ভাঙতে চায়, পুলিশ আত্মরক্ষার্থে লাঠি-গুলি চালায়। বিরোধীদের দাবি, দ্বিতীয় একটি দল একই ভাবে গ্রেফতার বরণ করতে যায়, অকস্মাৎ পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে। আনন্দবাজার পত্রিকার রিপোর্ট, ‘পুলিশের লাঠির ঠকাঠক শব্দে ওই অঞ্চল মুখরিত হইয়া ওঠে।’ সরকারি মতে, সে দিনের ঘটনায় আহত দেড়শো জন, বিভিন্ন কাগজের রিপোর্টে সংখ্যাটা সাড়ে তিনশো থেকে চারশো। পরদিন শহর জুড়ে পুলিশ-জনতা খণ্ডযুদ্ধ চলে, গুলিও চলে। ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা সরকারি মতে উনচল্লিশ। বিরোধীদের মতে, আশি।

বিধানসভায় বামেরা অভিযোগ করেন, পুলিশমন্ত্রী কালীপদ মুখোপাধ্যায় লালবাজার কন্ট্রোল রুমে বসে জনতার উপর পুলিশের এই আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন। একটি সাপ্তাহিক কাগজের ছবি দেখিয়ে যতীন চক্রবর্তী দাবি করেন, টেলিফোনে গুলি চলার খবর শুনতে শুনতে কালীবাবু ‘তৃপ্তিধারা’ দোকানের রসগোল্লা খাচ্ছিলেন। সরকার পক্ষের বিজয় সিংহ নাহার পাল্টা বলেন, লাঠিচার্জ হবে, গুলি চলবে জেনেও কমিউনিস্ট নেতারা গ্রামের মানুষকে এগিয়ে দিয়ে নিজেরা ‘ঘোমটা টেনে’ লুকিয়ে ছিলেন।

নিরস্ত্র মিছিলের উপর এই ভয়ানক আক্রমণের একটা ব্যাখ্যা এই যে, তার কিছু দিন আগে কেরলে নির্বাচিত বাম সরকার ভেঙে দিয়েছিল নেহরুর কংগ্রেস। বাংলায় তার বদলা নিতে চায় বামেরা, ভয় ছিল কংগ্রেসের। একটা চরম শিক্ষা দেওয়ার দরকার মনে হয়েছিল, যাতে গ্রাম থেকে মানুষ এনে বার বার মহাকরণ ঘেরাওয়ের পালা বন্ধ হয়।

এক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান, কেউ যাতে পালাতে না পারে, তার জন্য ধর্মতলার চার দিক ঘিরে রাখা হয়েছিল। মেট্রো সিনেমার গলি, চিৎপুর রোড, ডেকার্স লেন, সর্বত্র রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিল সশস্ত্র পুলিশ। প্রাণ বাঁচাতে লোকে আশেপাশের গলিতে ঢুকে পড়ে, পিছনে ধাওয়া করে পুলিশ। কিছু ক্ষণের মধ্যে এসপ্ল্যানেড চত্বর ফাঁকা হয়ে যায়। রাত সাড়ে দশটায় সেখানে গিয়ে আনন্দবাজারের রিপোর্টার দেখেন, ‘‘রাস্তার উপর অজস্র জুতা মালিকবিহীন অবস্থায় পড়িয়া আছে। এখানে ওখানে ছেঁড়া কাপড়, জামা, গামছা, টিফিন কেরিয়ারের বাটি, রুটি, মুড়ি গড়াগড়ি খাইতেছে।... একটু দূরে খানকয়েক আধলা ইট এবং রাস্তার বিজলী বাতির ভাঙ্গা কাঁচের অজস্র টুকরার ছড়াছড়ি দেখা যায়। কিছুক্ষণ আগেই এক পসলা বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে, মেঘের ফাঁক দিয়া এক ফালি চাঁদ উঠিয়াছে। মনে হইতেছিল তাহার বিস্ময়ের বুঝি আর সীমা নাই।’’

ষাট বছর পরে কী দেখল অফিস টাইমের সূর্য? চোদ্দো বছরের সরোজ দাস, উনিশ বছরের অভিমন্যু সাহু, কুড়ি বছরের কানন ঘোষের কথা মনে করে কেঁপে উঠল কি রাজভবনের পূর্ব দ্বারের ছায়া? গত ছয় দশকে রাষ্ট্রের হাতে নিহত অগুন্তি নাগরিকের অশরীরী মিছিলে তারা মিলিয়ে গিয়েছে। ভালই হয়েছে। যতই বলি আন্দোলনের শহিদ, আসলে তো বুভুক্ষু মানুষ, যারা পুলিশের মারের থেকে পালাতে চেয়েও পারেনি, জাঁতাকলে পড়া ইঁদুরের মতো মরেছে। রাতের অন্ধকারে শ্মশানে অজ্ঞাতপরিচয় লাশ ফেলে দিয়ে গিয়েছে পুলিশ। এ কি মনে রাখার মতো মৃত্যু? ৩১ অগস্ট কি মনে রাখার মতো দিন?

বিয়াল্লিশের মন্বন্তর তবু চার্চিলের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায়। স্বাধীন ভারতে সরকারি প্রশ্রয়ে কালোবাজারির জেরে খাদ্যসঙ্কট, ক্ষুধার্ত মানুষের উপর গুলি, লজ্জা যেন গলা চেপে ধরে। বিস্মৃতি ব্যবস্থাও পাকা করেছিল কংগ্রেস। খাদ্য আন্দোলনের সমস্ত পুলিশ ফাইল নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, লিখছেন ইতিহাসবিদ সুরঞ্জন দাশ।

তবু সত্যটা ধরে রাখার চেষ্টা ছিল। বিধানসভায় জ্যোতি বসু, হেমন্ত বসু, গুলাম ইয়াজদানি, সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়, যতীন চক্রবর্তী একে একে বিবৃতি পড়েছেন ৩১ অগস্টের ঘটনার। সংবাদপত্রগুলো তা রিপোর্ট করেছে, যাতে সরকারি প্রচারের পাশাপাশি আর একটা বয়ান লেখা থাকে। অশালীন গালি দিয়েছেন দু’পক্ষই, জ্যোতিবাবু জুতো তুলেও দেখিয়েছেন। তবু ভাষণের সারবত্তা ছিল। খাদ্যনীতির ব্যর্থতা চিরে চিরে দেখিয়েছেন বিরোধীরা। ভাগ্যিস, এখন যেমন সংসদ-বিধানসভার বিতর্ক কলতলার ঝগড়ায় পরিণত হয়েছে, তখনও তেমন হয়নি। বিধানসভার ওই সব তথ্য-ঠাসা বিবৃতি আর বক্তৃতাই আজ আমাদের উত্তরাধিকার।

বিস্ময়ের যদি কিছু থাকে, তবে তা অ-পরিবর্তনে। বিস্মৃতির পর্দা একটু দুলে উঠলেই ধরা পড়ে যায়, একত্রিশের সে রাত আজও কাটেনি। হিজিবিজবিজ যেমন নাম বদলে কখনও তকাই, কখনও বিস্কুট, তেমনই সে দিনের মুনীশ্বর মহাশয় আজ কখনও অমরেন্দ্র সিংহ, যিনি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কোনও হিংসা দেখতে পান না, কখনও অজিত ডোভাল, যিনি কার্ফু-কবলিত কাশ্মীরে দেখছেন অল ইজ় ওয়েল। সরকারি বয়ান যত দূরে যায় সত্যের থেকে, দুইয়ের মাঝে পড়ে আজও ততই ঝুঁকি বাড়ে নাগরিকের। শেষ অবধি কোন ধারায় ফেলবে, দেশদ্রোহিতা না কি ধর্মে আঘাত, না কি সরাসরি গুলিই চলবে সে দিনের মতো, সেটুকুই জানা বাকি থাকে শুধু।