কোনও রাজনীতিক রাজনীতিতে উচ্চস্থান অর্জন করেন তাঁর নিজস্বতা তথা ব্যক্তিত্ব তথা বিশেষত্বের জন্য। এমনটাই জানা ছিল। স্বচ্ছ বোধবুদ্ধিও সে কথাই বলে। কিন্তু মাঝে মাঝেই সে তত্ত্বের যথার্থতা নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে আজকাল। কোনও কোনও রাজনীতিককে দেখে প্রশ্ন জাগে— এঁরা কি নিজস্বতার কারণে উচ্চস্থানে পৌঁছেছেন, নাকি নিজস্বতা বিসর্জন দেওয়ার সক্ষমতাই এঁদের উন্নতির সিঁড়ি?

দেশের বস্ত্রমন্ত্রী স্মৃতি মলহোত্র ইরানির একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এই সংশয়ের কথাটা আজ তুলে ধরতে হচ্ছে। তবে এই সংশয়টা শুধুমাত্র স্মৃতি মলহোত্র ইরানিকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে, এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। তালিকা তৈরি করতে বসলে প্রলম্বিত হতেই থাকবে, দিল্লি থেকে কলকাতা পর্যন্ত টানাটানি শুরু হবে। তাই স্মৃতি মলহোত্র ইরানির দুর্ভাগ্যজনক বক্তব্যটির প্রসঙ্গে আসা যাক।

শবরীমালা পাহাড়ে স্থিত আয়াপ্পা মন্দিরে ঋতুমতী মহিলাদের প্রবেশের পথ বিজেপি যে ভাবে আটকে দিতে চাইছে, সে প্রসঙ্গে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন বিজেপি নেত্রী তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি। প্রশ্নটার সম্মুখীন হয়ে স্মৃতি পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন। ঋতুস্রাবের রক্তে ভেজা স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে কেউ কি বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার কথাও ভাবেন? মন্দিরে যাওয়ার কথা তা হলে ভাবছেন কেন? প্রশ্ন মন্ত্রীর।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

স্মৃতি মলহোত্র ইরানির মতো কোনও ব্যক্তিত্বের মুখে এ সব মন্তব্য শুনলে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। রাজনীতিই আপনার একমাত্র পরিচয়, তা তো নয় স্মৃতি। আপনি তো আলোয় এসেছিলেন আপনার শিল্পী সত্তা নিয়ে, আপনার চেতনার বিশিষ্টতা নিয়ে। নারীর অধিকার নিয়ে বা সামাজিক ন্যায় নিয়ে আপনাকে তো নানা অবকাশে সরব ও সক্রিয় হতে দেখেছি। রাজনীতিতে আসার আগেও দেখেছি, রাজনীতিতে আসার পরেও দেখেছি। কখনও নারীর ক্ষমতায়নের দাবিতে সরব হতে দেখেছি। কখনও দেখেছি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মহিলাদের অবদানের কথা আরও বেশি করে স্কুলে পড়ানোর পক্ষে সওয়াল করতে। আপনি কি সেই স্মৃতি মলহোত্র ইরানিই? নাকি আপনি অন্য কেউ? ধন্দ তৈরি হচ্ছে।

শবরীমালার মন্দিরে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নে যে সাংঘাতিক অযৌক্তিক ভেদাভেদ করা হয়, তার বিপক্ষে রায় দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তার পরেও স্মৃতি ইরানি বুঝিয়ে দিলেন, শবরীমালা নিয়ে বিজেপি যে অবস্থান নিয়েছে, তিনি সে অবস্থানের বিরুদ্ধে নন।

আরও পড়ুন: 'স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে বন্ধুর বাড়ি যান? তা হলে মন্দিরে কেন?' এই কথা বললেন স্মৃতি!

প্রথমত আপনি এখন একজন মন্ত্রী। বিজেপির প্রতি দায়বদ্ধতার চেয়ে দেশের প্রতি বা নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা আপনার অনেক বেশি এখন।

দ্বিতীয়ত আপনি বিশিষ্ট নাগরিক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করার পরে রাজনীতিতে এসেছেন। রাজনীতিতে এসে বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন, এমন নয়। শুধুমাত্র দলের শেখানো বুলি আউড়ে যাঁরা উপরে ওঠেন, দলের ভুলগুলোকেও অক্লেশে সমর্থন করে যাওয়ার দায় তাঁদের কিছুটা থাকতে পারে। আপনার তো সে দায় থাকার কথা নয়।

অতএব শবরীমালা প্রসঙ্গে আপনার অবস্থানকে দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হচ্ছে। একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা আপনার উচিত নয়, সে বোধ আপনার রয়েছে। আদালতের রায়ের বিরোধিতা আপনি করছেন না,এ কথা আপনি মুখে বলেওছেন। কিন্তু যাঁরা আদালতের রায়ের বিরোধিতা করছেন, তাঁদের বিরোধিতাও যে করছেন না, তাও সুকৌশলে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

রাজনীতিকদের যে নানা কৌশল জানতে হয়, সে কারও অজানা নয়। কিন্তু মানবতার বুনিয়াদি শিক্ষাগুলোর সঙ্গে জড়িত যে প্রশ্নগুলো, সেগুলোর উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তত কৌশলী হতে নেই। আবার বলি, এ ক্ষেত্রে এত কৌশলী অবস্থান নেওয়ার দায় কিন্তু আপনার ছিল না। কারণ, প্রথমত আপনি মন্ত্রী, দ্বিতীয়ত আপনি শিল্পী। নিজের বিশিষ্টতা রাজনীতিতে সঞ্চারিত করাই আপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আপনি রাজনীতির পাঁকটাকে সঞ্চারিত করলেন, নিজস্বতার বিসর্জন ঘটালেন। দেশের জন্য তো বটেই, আপনার নিজের জন্যও দুর্ভাগ্যজনক হল বিষয়টা।