এ দিকে বাংলাতে জাঁকিয়ে বসেছে ব্রিটিশরা। তারা নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থেই বোঝার চেষ্টা করল বাংলার নদীকে। রেনেল সাহেবের উপর দায়িত্ব পড়ল বাংলার নদী জরিপের। ৩৯ জন সহায়ককে নিয়ে ১৭৬৪ সালের ৭ মে ভাগীরথীর পথ ধরে নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন তিনি। নবদ্বীপের কাছে জলঙ্গির মোহনা দিয়ে প্রবেশ করে পদ্মা হয়ে তিনি ঢাকার দিকে যান। এই যাত্রাপথের তিনি একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা তাঁর ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর বর্ণনাতে জলঙ্গি নদীর একটি সাঙ্কেতিক নামও দেন  ‘ওয়াই ই’। 

১৭৬৪ সালের ১২ মে তিনি প্রথম জলঙ্গির মোহনাতে প্রবেশ করেন। সেই সময় নদীর মোহনাটি ছিল সঙ্কীর্ণ। মাঝারি আকারের নৌকা নদীতে চলাচল করতে পারত। হাউতনগরের কাছে নদী ১৩৭.১৬ মিটার বা ১৫০ ইয়ার্ড বা গজ চওড়া ছিল। মোহনার পর থেকে জলঙ্গি নদী ক্রমশ অগভীর ও বক্র হয়ে ওঠে। ফলে ১৩ মে রেনেল কেবলমাত্র ৩৫.৪০ কিলোমিটার পথই অতিক্রম করতে পারেন। ওই রাতে তিনি তেঘরির কাছে বিশ্রাম নেন। ১৪ মে রেনেলকে ঝড়–বৃষ্টির মধ্যে পড়তে হয়। সেই দিন তাই রেনেল ২৫.৭৪ কিলোমিটার পথই যেতে পেরেছিলেন। সে রাতে নতিডাঙ্গার কাছে এসে রেনেল বিশ্রাম নেন। ১৫ মে রেনেল ফের ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে পড়েন। তার উপরে নদীর পথ এতটাই আঁকাবাঁকা ছিল যে, তাঁদের নদীপথে যেতে খুবই অসুবিধা হচ্ছিল। পঞ্চদহের কাছে রেনেল সাহেব জলঙ্গি নদীকে দেখেছিলেন ২০০ ইয়ার্ড চওড়া (১ ইয়ার্ড = ০.৯১৪৪মিটার) আর গভীরতা ছিল ৬ কিউবিট (১ কিউবিট = ১৮ ইঞ্চি)।

এ দিনই আরও ১০ মাইল এগিয়ে সন্ধ্যায় গৌগাটির কাছে পৌঁছন। সেখানে তিনি দেখলেন নদীর মাঝে ১৯টি লবণবোঝাই বড় নৌকা। যার থেকে বোঝা যায় সেই সময় এই নদীপথ দিয়ে লবণের আমদানি-রফতানি হত। ১৬ মে বক্সীপুর পার হওয়ার পথে রেনেলকে খুব সমস্যার মুখে পড়তে হয়। কারণ, নদীতে কেবল মাত্র ১.৫ কিউবিট জল থাকার কারণে নৌকা চালাতে খুব সমস্যা হচ্ছিল। সে দিন রেনেল ১০ মাইল যেতে পেরেছিলেন। যোগীপুরের কাছে নদী ছিল ৪ কিউবিট গভীর। ১৭ মে নদী দিয়ে রেনেলের নৌকা আরও ১১.৫ মাইল এগিয়ে যায়। জলঙ্গির যতই উৎসের দিকে রেনেল  এগিয়েছেন নদীকে ততই দেখেছেন আঁকাবাঁকা। সে দিন রাতে স্বস্তিপুরের কাছে জলঙ্গি নদীর সঙ্গে মিশে যাওয়া একটি নালাতে রেনেল আশ্রয় নেন। ১৮ মে সকালে জলঙ্গি থেকে খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহের জন্য লোক পাঠিয়ে রেনেল আবার যাত্রা শুরু করেন। সে দিন নদীপথে রেনেল আরও ১১ মাইল এগিয়ে যান। পরের দিন সকালে তিনি ফের যাত্রা শুরু করেন। জলঙ্গির উৎস মুখের ৩ মাইল ভাটির দিকে জলের পরিমাণ ছিল খুবই কম। সেই জন্য রেনেলের নৌকা সেখানে আটকে যায়। নৌকাকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে দিন দুপুরেই জলঙ্গির উৎস হয়ে রেনেল পৌঁছে গেলেন পদ্মাতে।

১৭৯৭ সাল। ক্যাপ্টেন কোলব্রুক সাহেব ফের বাংলার নদীগুলোকে বোঝার চেষ্টা করলেন। তিনি লিখলেন ‘এ মেময়ার অন দ্যা গাঞ্জেস’। সেখানে তিনি লিখলেন, শুখা মরসুমে জলঙ্গি নদীতে জল থাকছে না। আবার মেজর লং সাহেব লক্ষ করলেন যে, জলঙ্গির উৎসমুখ, জলঙ্গি গ্রামেই অনেকটা নীচের দিকে ছিল। ১৮৬৩ সালে পদ্মার গতিপথ পরিবর্তন করে রাজাপুর ও আলিপুরের নীচের দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শুরু করে। ফলে জলঙ্গির উৎসমুখ ২.৫ মাইল দক্ষিণ পশ্চিম দিয়ে অর্থাৎ জলঙ্গি গ্রামের দিকে সরে আসে। এখানে একটা কথা উল্লেখ করতে হয় যে,  ১৮২০ সাল থেকে ১৮৩১ সালের মধ্যে জলঙ্গির উৎস মুখ ৩২৯.১৮ মিটারের বেশি সরে যায়নি। 

১৮৩২ সালে পদ্মা ফের তার পূর্বের পথে সরে যেতে শুরু করে। জলঙ্গির এই সময় দুটো উৎসমুখ ছিল। একটি পূর্ব দিকে, অন্যটি পশ্চিম দিকে। পদ্মার জল কোনও সময় পূর্ব দিকের উৎসমুখ দিয়ে, কখনও বা পশ্চিম দিকের মুখ দিয়ে বেশি প্রবেশ করত। ১৮৩৩ সালে সেচ দফতর উৎসমুখ দিয়ে ছোট নৌকা যাতায়াতের জন্য দু’হাত পরিমাণ বালি ড্রেজিং করে।

বাংলার নদীচর্চার ইতিহাসে ঘটল একটা বিরল ঘটনা। ১৮৪৬-৪৭ সালে রাজাপুরের বিপরীতে অর্থাৎ পদ্মার ডান পাড় ভাঙতে শুরু করে। এই ভাঙনে মাথাভাঙা ও জলঙ্গির মধ্যের ভূমিভাগটি ভেঙে মাথাভাঙা ও জলঙ্গির উৎসমুখটি এক হয়ে যায়। ১৮৫১ সালে পদ্মার পাড় বরাবর ভাঙতে শুরু করে। জলঙ্গির উৎসমুখের ঠিক নীচে একটি বাঁক তৈরি হয়। যার ফলে শুখা মরসুমেও জলঙ্গিতে পদ্মা থেকে প্রচুর জল ঢোকে। ১৮৫২ সালে দয়ারামপুরের দিকের জলঙ্গির উৎস মুখটি আধ মাইল চওড়া ও পনেরো ফুট উঁচু চর পড়ে যাওয়ার জন্য জলঙ্গির একটা মুখ বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৫৩ সাল জলঙ্গির উৎসমুখ পূর্বদিকে এক মাইল সরে যাওয়ার জন্য জলঙ্গির উৎসমুখে জলের অভাব শুরু হয়। 

১৮৭১ ও ১৮৭২ সালে পরপর দু’বছরের বন্যায় জলঙ্গির উৎস মুখে ক্রমশ পলি পড়ে বুজে যেতে থাকে। ফলে বর্ষার সময় ছাড়া বাকি সময়ে উৎসমুখ দিয়ে জলঙ্গি নদীতে জল প্রবেশ করত না। ১৯২৫ সাল পর্যন্ত জলঙ্গির যে দুটো উৎসমুখ ছিল তা মূলত পরিচিত ছিল একটি পুরোনো জলঙ্গি ও আর একটি ধারা শুধু জলঙ্গি নামে। ১৯২৬ সালের জলঙ্গি নদীর একটি নতুন উৎসমুখ তৈরি হয়। যা লালগোলা ঘাট থেকে মোক্তারপুর পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। এই ধারাটির নাম দেওয়া হয় ভৈরব জলঙ্গি। নতুন এই ধারাটির দৈর্ঘ্য ছিল ৬১ মাইল। আর বাউসমারি থেকে পুরনো জলঙ্গির ধারাটি ছিল ৩১ মাইল। 

১৯৩৪ সাল পর্যন্ত জলঙ্গির উৎস মুখের তেমন পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। ১৯৩৫-৩৬ সালে একটি মাঝারি বন্যা হয়। আর সেই বন্যাতে জলঙ্গির উৎসমুখের পলি সরে গিয়ে পদ্মার জল জলঙ্গিতে প্রবেশ করে। ১৯৩৭ সালে জলঙ্গির উৎসমুখ আবার পলি পড়ে বুজে যায়। তাই পদ্মার জল আর জলঙ্গিতে প্রবেশ করতে পারে না। 

১৯৩৭ থেকে ২০১৮। এই দীর্ঘ আট দশকে জলঙ্গি দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। জলঙ্গি কেবল বেঁচে আছে এখন ভৈরবের জলে। ২০১৯ সালে নদীটার উৎসমুখ কি এখন আছে? যদি থাকে তবে কেমন অবস্থায়? জয়রামপুরের কাছে গিয়ে শোনা গেল, এখানে একটা নদী আছে। নদীর নাম খরে। স্থানীয় লোকজন জলঙ্গি ও খরেকে আলাদা দুটো নদী বলে দেখাচ্ছেন। সন্দেহটা দানা বাঁধল।  কৃষ্ণনগরের কাছে জলঙ্গি নদীকে খরে বলে ডাকা হয়। জলঙ্গির উৎস মুখের দিকে এ কোন নদী? যাকে স্থানীয় মানুষেরা খরে বলছে! উত্তর নিরসন করতে সাহায্য নিতে হল জিপিএস–এর। সেখানেই পাওয়া গেল নিখুঁত অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ। আর সে মানকে রেনেল সাহেবের আঁকা ১৭৮০ সালে প্রকাশিত ‘ম্যাপ অব দ্যা কাশিমবাজার আইল্যান্ড’ মানচিত্রের সঙ্গে তুলনা করা হল। দেখা গেল, স্থানীয় মানুষেরা যাকে খরে নদী বলছে, আসলে সেটা ১৭৬৪ সালের জলঙ্গি নদীর পশ্চিম দিকের একটা উৎসমুখ। যেটা কলকলি নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে মিলিত হত জলঙ্গি নদীতে। 

আজ এই নদীটা খোঁজা খুবই দুষ্কর। নদীর বুক হয়ে গিয়েছে চাষের জমি। যব, গম, মুসুরি, সরষে, লঙ্কা সবই চাষ হয় নদীর বুকে। কোনও কোনও জায়গায় অবশ্য কাদা। ছিপছিপে জলও রয়েছে। সেখানে জন্মেছে কচুরিপানা। এতো একটা উৎসমুখ হল। অন্য উৎসমুখটার কী হল? রওনা দেওয়া হল টলটলির দিকে। সেখানে গিয়ে তো অবাক কাণ্ড। টলটলির ঘাটের নামের ফলক আছে কিন্তু নদী নেই। নদীর বদলে রয়েছে বালির চর। সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ট্রাক্টর। টলটলির ঘাট থেকে পদ্মা সরে গিয়েছে ৪.৫ কিলোমিটার। তা হলে জলঙ্গি নদীর উৎস মুখটা কোথায়? 

৪৩ নম্বর মধুবোনা বিএসএফ–এর ব্যাটেলিয়ন অফিসের সামনে এসে দাঁড়ালাম। অফিসের পাশের মেঠোপথ ধরে আমরা হেঁটে চললাম প্রায় এক কিলোমিটার। পথের শেষে দাঁড়িয়ে আছে বিএসএফের একটা ওয়াচ টাওয়ার। সামনে কাঁটাতারের বেড়া। বেড়ার ওপারে বাংলাদেশ। ডান দিকে বিস্তীর্ণ চাষের জমি। 

কিন্তু নদী? জলঙ্গির উৎসমুখ? সেটা কোথায়?  কাঁটাতারের ওপারে দেখা গেল একটা বদ্ধ জলের সোতা। তা হলে এটাই কি জলঙ্গি? উত্তরটা হ্যাঁ।  উৎসমুখ? আরও কিছুটা উত্তরে বাউসমারি ক্যাম্পের দিকে। তাই ফের হাঁটা শুরু হল। কাঁটাতারের সীমান্তের পাশ দিয়ে। এক কিলোমিটার হাঁটার পরে দূরে দেখা গেল বাউসমারি বিএসএফ ক্যাম্প। আর জলঙ্গি থমকে দাঁড়িয়েছে ক্যাম্পের পাশে। নদীর মুখটা নড়াচড়া করতে পারে না। নদী বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ‘জিরো অসিলেশন’। জলের অভাব বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে জলঙ্গি দাঁড়িয়ে থাকে অসহায় ভাবে। উৎসমুখের দিকে জলঙ্গি আর পদ্মার আজ কোনও যোগাযোগ নেই। পদ্মা সরে গিয়েছে চার থেকে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। পদ্মা-জলঙ্গি কেউ আজ কারও মুখ দেখে না।  

সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। এক বিএসএফ জওয়ান জানিয়ে দিলেন, আর থাকা যাবে না। এ বার ফিরে আসার পালা। শূন্যতা বুকে নিয়ে নদীকে বলে এলাম, ভাল থেকো নদী, ভাল থেকো জলঙ্গি।       

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।          

(শেষ)

নদী বিশেষজ্ঞ