সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ক্ষমতার লোভে হিন্দু মহাসভা জোটে মুসলিম লিগের সঙ্গেও

যাদের এই ইতিহাস, তারা যে সিএএ-এনআরসি বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে হুমকি দিয়ে দমিয়ে রাখতে চেয়ে আততায়ীর গুলি ছোড়ার ঘটনাকে সমর্থন করবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। লিখছেন দেবোত্তম চক্রবর্তী

hindu mahasabha

Advertisement

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি দেশবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, সেই প্রসঙ্গে সাভারকর ১৯৪১ সালে ভাগলপুরে হিন্দু মহাসভার ২৩তম অধিবেশনে বলেন— “So far as India’s defence is concerned, Hindudom must ally unhesitatingly, in a spirit of responsive co-operation, with the war effort of the Indian government in so far as it is consistent with the Hindu interests, by joining the Army, Navy and the Aerial forces in as large a number as possible and by securing an entry into all ordnance, ammunition and war craft factories।” 

যদিও ওই সেনাবাহিনীতে মুসলমানদের যোগ দেওয়ার ব্যাপারে তিনি নীরব ও নিস্পৃহ, কারণ তাঁর মতে “মুসলমানেরা প্রথমে মুসলমান, শেষে মুসলমান এবং কদাচ ভারতীয় নয়।”

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ শামসুল ইসলাম তাঁর ‘Muslim against Partition of India’ গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন: “So there is no doubt that the Two-Nation theory was neither the innovation nor monopoly of the Muslim separatists. Chronologically, Hindu variant appeared first and Muslim variant followed it aggressively।” অথচ, ক্ষমতার স্বাদ পেলে হিন্দু মহাসভা যে তার দীর্ঘলালিত মুসলমান-বিদ্বেষ এক লহমায় ভুলে যেতে পারে, এমনকি মুসলিম লিগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গড়তেও দ্বিধা করে না, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অব্যবহিত পরে কংগ্রেস মন্ত্রিসভাগুলির পদত্যাগের পর থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা দেখি, ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দিয়ে যখন গাঁধী-সহ পটেল, নেহরু, আজাদ প্রমুখ কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দ জেলে বন্দিজীবন যাপন করছেন, তখন হিন্দু মহাসভার দ্বিতীয় প্রধান নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পাকিস্তান প্রস্তাবের উত্থাপক ফজলুল হকের অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাংলায় প্রায় ১১ মাস দায়িত্ব সামলাচ্ছেন! একই ভাবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে খান আব্দুল জব্বর খান কংগ্রেস মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করলে মুসলিম লিগের প্রধানমন্ত্রী সর্দার আওরঙ্গজেব খানের অর্থমন্ত্রী হচ্ছেন হিন্দু মহাসভার মেহরচাঁদ খন্না! আর ১৯৪৩ সালের ৩ মার্চ সিন্ধু প্রদেশের আইনসভায় পাকিস্তান প্রস্তাব পাশ হওয়ার পরেও স্যর গুলাম হুসেন হিদায়েতুল্লার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার প্রয়োজন বোধ করছেন না মহাসভার তিন মন্ত্রী!

এর কারণ একটিই। ১৯৪২ সালের ২৮ অগস্ট ‘দ্য বম্বে ক্রনিকল’ পত্রিকায় সাভারকর হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, “The Hindu members must stick to their positions on the Defence bodies and the Councils... to capture as much political and military power as could possibly be done।” ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা করার হিন্দু মহাসভার এই নির্দেশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৪২-এর ২৬ জুলাই বাংলার ছোটলাট জন হার্বার্টকে একটি চিঠি লিখে কংগ্রেসকে মোকাবিলা করার পরিকল্পনা ছকে দেন এই ভাষায়: “Anybody, who during the war, plans to stir up mass feeling, resulting internal disturbances or insecurity, must be resisted by any Government that may function for the time being।” শুধু তা নয়, ব্রিটিশ সরকারের বিশ্বস্ত মন্ত্রী হিসাবে তিনি আন্দোলন দমন করার ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একই চিঠিতে ছোটলাটকে জানান, “Indians have to trust the British, not for the sake for Britain, not for any advantage that the British might gain, but for the maintenance of the defence and freedom of the province itself. You, as Governor, will function as the constitutional head of the province and will be guided entirely on the advice of your Minister।”

দেশ জুড়ে ন্যক্কারজনক ঘৃণার আবহ সৃষ্টি করা, একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদত দান, তীব্র ক্ষমতালিপ্সা, স্বাধীনতা আন্দোলনের পিঠে লাগাতার ছুরি মারা, ব্রিটিশদের প্রতি নির্লজ্জ চাটুকারিতার সঙ্গে আরএসএস-হিন্দু মহাসভার অপরিহার্য কার্যক্রম হিসাবে যুক্ত হয় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদী নেতা মহাত্মা গাঁধীকে হত্যা করার পরিকল্পনাটিও। তা-ও এক বার নয়, চার-চার বার। প্রথমে ১৯৪৪ সালে মহারাষ্ট্রের পঞ্চগনিতে বিকেলের প্রার্থনার সময় তাঁকে দেখতে পেয়ে ছুরি নিয়ে তেড়ে যান নাথুরাম বিনায়ক গডসে। এর পরে আরও দু’বার ব্যর্থ চেষ্টা করেন গডসে। ওই একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আরও এক বার গাঁধীকে হত্যা করার চেষ্টা করতে গিয়ে ছুরিসমেত ধরা পড়েন নাথুরাম। মৃত্যুর মাত্র দশ দিন আগে, ১৯৪৮-এর ২০ জানুয়ারি বিড়লা হাউজে গাঁধীজির বক্তৃতার সময়ে আবারও তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করেন গডসে। অবশেষে ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি বিকেলের প্রার্থনা সভায় যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ভিড় থেকে বেরিয়ে আসেন নাথুরাম। প্রথমে সাগ্রহে গাঁধীকে প্রণাম আর তার পরই পকেট থেকে বন্দুক বের করে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে পর পর তিনটে গুলি। অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে ঘোষণা করেন সদ্য স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু, নাথুরাম গডসের গুলিতে নিহত হয়েছেন ‘বাপু’।

এই যাদের ইতিহাস, তারা যে সিএএ-এনআরসি বিরোধী গণতান্ত্রিক অহিংস আন্দোলনকে হুমকি দিয়ে দমিয়ে রাখতে চাওয়া আততায়ীর গুলি ছোড়ার ঘটনাকে সমর্থন করবে, ‘মহান’ নাথুরামের সার্থক উত্তরসূরি হিসাবে সেই আততায়ীকে সংবর্ধিতও করতে চাইবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথ বহু আগেই বলেছিলেন, “ভারতবর্ষের কেবল হিন্দুচিত্তকে স্বীকার করলে চলবে না। ভারতবর্ষের সাহিত্য শিল্পকলা স্থপতিবিজ্ঞান প্রভৃতিতেও হিন্দু-মুসলমানের সংমিশ্রণে বিচিত্র সৃষ্টি জেগে উঠেছে। তারই পরিচয়ে ভারতবর্ষীয়ের পূর্ণ পরিচয়।” 

কিন্তু একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হিন্দু মহাসভা ও তার সহযোগী দলগুলো রবীন্দ্রনাথের কথায় বিশ্বাসী নয় বলেই তারা সৃষ্টি করবে দেশপ্রেমের নতুন সংজ্ঞা। সেই সংজ্ঞা অমান্যকারীদের নির্দ্বিধায় চিহ্নিত করবে ‘দেশদ্রোহী’ বলে। আর অগণিত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ উপলব্ধি করবেন রবীন্দ্রনাথের দূরদৃষ্টি, আরও একবার—  

‘‘একদিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে

রাজার দোহাই দিয়ে

এ যুগে তারাই জন্ম নিয়েছে আজি,

মন্দিরে তারা এসেছে ভক্ত সাজি—

ঘাতক সৈন্যে ডাকি

‘মারো মারো’ ওঠে হাঁকি ।

গর্জনে মিশে পূজামন্ত্রের স্বর—

মানবপুত্র তীব্র ব্যথায় কহেন, হে  ঈশ্বর!’’                                         

(শেষ)

লেখক ইংরেজির শিক্ষক

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন