পুলিশরা ব্যস্ত নির্বাচন, মিটিং-মিছিল, সভা নিয়ে, আর এ দিকে প্রায় প্রতি দিনই কোনও না কোনও এলাকায় নিত্য নতুন বাঁশের খুঁটি পুঁতে দেখা হচ্ছে যে সেখানে নতুন হকার স্টল খোলা যাবে কি না! কলকাতার কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছেন যে কলকাতার ‘লন্ডন’ হওয়ার কোনও আশা নেই। বরং রাতভর ছোট ছোট চিনা আলোর সারি ঘেরা দিন দিন বেড়ে চলা বস্তি আর ঝুপড়িই এখন কলকাতার অভিজ্ঞান। রাস্তার দোকানি, যাঁদের আইনি পরিভাষায় হকার বলা হয়, তাঁরা শহরের প্রায় সব জায়গাই দখল করে নিচ্ছেন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। এই গতি এতটাই উদ্বেগজনক যে মনে হয় হকার আধিপত্য তৈরি করে শহরকে এক বৃহৎ বস্তিতে রূপান্তরিত করার মহাপরিকল্পনা করা রয়েছে, নয়তো রয়েছে টুঁ শব্দটি না করার ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র। যেটা বুঝে নেওয়া জরুরি তা হল, নতুন আইনটি অদূর ভবিষ্যতে এক বার চালু হয়ে গেলে রাস্তার হকারদের আর কোনও দিনই সরানো সম্ভব হবে না। 
কেউই অবোধ শিশুর মতো দাবি করছেন না যে, সব হকারকে এখনই কলকাতা থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। পৃথিবীর কোনও বড় শহরেই তা সম্ভব হয়নি। আমরা জানি, কলকাতা কেবল আদ্যন্ত একটি রাজনৈতিক শহর নয়, তার সঙ্গে অতি দরিদ্র শহরও বটে। এখানে ফুটপাতে জিনিস বেচাকেনা করে লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবনধারণ করেন, কোনও কর না দিয়ে, পরিকাঠামোর জন্য প্রায় কোনও খরচ না করে। ১৯৯৬ সালে দেখেছি তৎকালীন মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর ‘অপারেশন সানশাইন’ নামক হকার-উচ্ছেদ গিমিকটির পর কত দ্রুত এবং দ্বিগুণ উদ্যমে হকাররা পুনরায় কলকাতার ফুটপাথ দখল করেছেন। যে ৭০০০ হকারকে গড়িয়াহাট, শ্যামবাজার, হাতিবাগান, যাদবপুর, বেহালা, কসবা ইত্যাদি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, তাঁদের জন্য কলকাতা পুরসভা কোটি কোটি টাকা খরচ করে নিউ মার্কেট তৈরি করে দেয়। এবং এই ঘটনার পরে নিউ মার্কেট, চৌরঙ্গি, ধর্মতলা অঞ্চলে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ রাস্তা হকারের দখলে চলে যায়, হাঁটার জায়গাটুকুও থাকে না। সত্যিই এলাকাটা যেন হকারদের মুক্তাঞ্চল হয়ে ওঠে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এর জন্য প্রত্যহ প্রচুর টাকা হাত বদল হতে শুরু করে, বিশেষত এই জমানায়। 
এই পরিপ্রেক্ষিতেই নতুন আইনটি সম্পর্কে জেনে নেওয়া দরকার। এটি সর্বভারতীয় আইন: স্ট্রিট ভেন্ডরস (প্রোটেকশন অব লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন) অ্যাক্ট, ২০১৪ সালে ইউপিএ সরকার ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার ঠিক আগে এটা জারি করে। পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য গত বছর অগস্ট মাসের আগে এই আইন গৃহীত হয়নি। এই আইনের তাৎপর্য কী, তা বোঝার আগে মনে রাখতে হবে যে কলকাতায় হকার বিক্ষোভের ইতিহাসটা বেশ দীর্ঘ— প্যারিস, কায়রো কিংবা রিও ডি জেনেইরোর মতোই। আমাদের মনে পড়বে, এলা ভাট-এর সেল্ফ এমপ্লয়েড উইমেন‌্স অ্যাসোসিয়েশন (সেবা) আন্দোলনের কথা। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৭০-এর দশকের প্রথম ভাগে আমদাবাদের গরিব মহিলা হকারদের নিয়ে তৈরি হওয়া এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পুলিশি অত্যাচার এবং পুর-কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে গরিব, অশিক্ষিত মহিলারা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এই আন্দোলন ভারতের ইতিহাসে একটা মাইলফলক হয়ে রয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে একটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ধারণাও তৈরি হয়েছে: পুলিশ বা পুর-কর্তৃপক্ষ রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য হকার উচ্ছেদ করলে তারা নিষ্ঠুর, আর তা না করলে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত। দুটো দিকই সত্যি— কোন এলাকা এবং কোন আমলের কথা আমরা বলছি, তার ওপরই নির্ভর করবে কোনটা কতটা সত্যি। অবশ্য এই জমানায় কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের পুলিশদের তো তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চেয়ে অনেক বেশি মান্য করতে হয় নেতা-মন্ত্রীদের। এ ভাবেই অধুনা একটা নতুন ক্ষমতাশালী নিচুতলার গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যাঁদের মধ্যে পড়েন কাউন্সিলর, এমএলএ, স্থানীয় নেতা এবং অকুতোভয় সিন্ডিকেট সদস্যরা। হাতে ও আঙুলে আংটি ইত্যাদির বাহারে, আর গলায় মোটা সোনার চেন ঝুলিয়ে তাঁরা ঠিক করেন, কে কোন কাজটা কোথায় কী ভাবে করবে। তবে, একমাত্র এঁরাই পশ্চিমবঙ্গের হকারদের নিয়ন্ত্রণকর্তা, এমন বলাটা সরলীকরণ হয়ে যাবে। এঁদের আগেও হকাররা ছিলেন, এঁদের পরেও থাকবেন। এই নতুন গোষ্ঠীটি কেবল বর্তমান হকারদের অনিয়ন্ত্রিত (অথবা পরিকল্পনামাফিক) যত্রতত্র উপচে পড়া বিস্তৃতিতে মদত দিচ্ছে মাত্র। 
পশ্চিমবঙ্গে পর পর যাঁরা মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে শিল্পপতিদের ডেকে এনেও তাঁরা রাজ্যে চাকরির সুযোগ বাড়াতে পারেননি। ফলে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, রাস্তায় স্টল বানিয়ে রোজগারপাতি করার অধিকারটা স্বীকার করে নিতে হয়েছে। মহামান্য নেত্রীর সাফল্য ও আশ্বাস সম্বলিত হোর্ডিং-এর নীচে বসেই হকাররা ফুটপাথ দখল করে, রাস্তা আটকে, বিদ্যুৎ হুক করে, আগুন জ্বালিয়ে দিব্যি ব্যবসা চালাচ্ছে। আবার এটাও ঠিক, যে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে কাজের জন্য রোজ সারা দিন ঘোরাঘুরি করছে, রাস্তাতেই তো তাদের খাওয়াদাওয়া সারতে হচ্ছে। আর রাস্তার স্টলের খাবারের চেয়ে সস্তা আর কী-ই বা হতে পারে। সেই কারণেই এই স্টলগুলো কোনও দিনই সরবে না। এবং শীঘ্রই হয়তো মুখ্যমন্ত্রী একটা ‘পুষ্টিকর’ স্কিম চালু করবেন, যাতে এই সব খাবারের স্টলের জন্য জলের ব্যবস্থা ও নিকাশি ব্যবস্থাও করা যায়, যাতে খরিদ্দাররা আধা-ধোয়া থালার জীবাণু থেকে রক্ষা পান। কলকাতা পুরসভার রেকর্ড অনুযায়ী ২০০৫ সালে ২৫৩০টি ফুড লাইসেন্স বিতরণ করা হয়েছিল। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫১৮২। এই তুলনায় ছোট সংখ্যাটি নিশ্চয় ফুটপাতের দোকানের নয়— বরং লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকানের, যেগুলি ফুটপাত স্টলের চেয়ে পরিষ্কার থাকার কথা। কিন্তু এ ছাড়া যে হাজার হাজার ফুটপাতের দোকান নিত্য চলছে, তার রেকর্ড কলকাতা পুরসভার কাছে নেই। 
আসা যাক রাস্তার হকারদের জন্য সর্বভারতীয় আইন এবং সেই অনুযায়ী রাজ্যের বিধির কথায়। যেখানে হকাররা রাস্তা ও ফুটপাথের দখল নিয়ে বসে রয়েছেন, আইন অনুসারে সেখানে স্থানীয় পুরসভাগুলিকে অনেকগুলি টাউন ভেন্ডিং কমিটি (টিভিসি) তৈরি করতে হবে। এই কমিটিগুলিতে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, ব্যবসায়ী সমিতি ও বিভিন্ন স্তরের হকারদের ও ব্যাঙ্কের প্রতিনিধিরা থাকবেন। ছোট পুরসভা হলে সেখানে প্রতিনিধির সংখ্যা হবে সর্বোচ্চ ১২ জন, মাঝারি পুরসভায় ১৫ জন এবং বড় পুরসভার ক্ষেত্রে, সর্বোচ্চ ১৮ জন। হকারদের তরফে প্রতিনিধির সংখ্যা হবে ৪০ শতাংশ, যার মানে এই প্রতিনিধিরা নীতিকে প্রভাবিত করতে পারবেন। উপরন্তু আইনের তিন নম্বর ধারা অনুয়ায়ী কমিটির নির্দিষ্ট সমীক্ষার রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত কোনও হকারকে উচ্ছেদ করা যাবে না। তার পর, যাঁরা ‘আগে থেকেই ছিলেন’, সেই সব হকারকে লাইসেন্স দিতে হবে। ঠিক এই কারণেই হয়তো অনেক হকার সমীক্ষা-দল পৌঁছনোর আগেই দোকান তৈরি করে রাখেন। আইনটি সর্বতো ভাবেই হকারদের পক্ষে। এবং আইনের ১২ থেকে ১৫ নম্বর ধারায় তা পরিষ্কার করেই বলা রয়েছে। আইনে কিছু নিয়ম মানার কথা বলা হয়েছে, যেমন পিচ রাস্তা দখল করা যাবে না, কিন্তু এই সব নিয়ম প্রয়োগ করা প্রায় অসম্ভব। রাজ্যের বিধিটিতে আগুন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা আছে। কিন্তু তা-ই যদি হয়, তবে রাস্তার ধারের দোকানে রান্না হবে কী করে? এ ছাড়াও প্লাস্টিক ও ত্রিপলের চাদর ব্যবহারও না কি নিষিদ্ধ। মাননীয় মেয়র আমাদের কয়েকটি ‘মডেল’ অগ্নিনিরোধক স্টল দেখিয়েছেন। কিন্তু এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই যে হকাররা তাঁদের জন্য মার্কা-দেওয়া জায়গার মধ্যেই নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখবেন। ‘হকারমুক্ত অঞ্চল’ও ঘোষণা করার কথা বলা আছে। কিন্তু আইন যেখানে স্পষ্টত হকারদেরই সহায়তা করে, সেখানে এ সব বিধিনিষেধ কেবল কথার কথা! 

হয়তো সত্যিই এই আইন পুলিশি জুলুম থেকে হকারদের বাঁচাতে পারবে। কিন্তু স্থানীয় তোলাবাজদের হাত থেকে তাঁদের রক্ষা করবে কে? এই আইনের ৪ নম্বর ধারা অনুয়ায়ী লাইসেন্স বিলি করা, এবং ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স নবীকরণ ও উত্তরাধিকার নিশ্চিতকরণ— এই সবের আগে এখনও ভেবে দেখার সময় আছে। ঠান্ডা মাথায় ভাল করে ভেবে নিয়ে, ফুটপাত আর সংলগ্ন রাস্তার প্রতিটি ইঞ্চি চিরতরে বেহাত হয়ে যাওয়ার আগে, অঞ্চল ধরে ধরে ঠিক করা দরকার যে, ‘হকার অঞ্চল’ ঠিক কোথায় কোথায় তৈরি হওয়া উচিত। আমরা জানি যে, বাস্তবিক হকারদের ছাড়া আমাদের রোজকার জীবন অচল। সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান, এমনকি পুরনো বইয়ের স্টলও আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ। কিন্তু প্রশ্নটা হল: কত স্টল? এবং কোথায় কোথায়? পরবর্তী চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে যাওয়ার আগে এই প্রশ্নের সমাধান জরুরি।