Advertisement
E-Paper

একটা অন্য জাতীয়তাবাদ তো আছে

বিজেপি বলছে, তারাই জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। প্রতিবাদীরা বলছেন, বিজেপি নিপাত যাক, জাতীয়তাবাদ নিপাত যাক! মাঝখান থেকে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, বিজেপি-আরএসএস যা বলে যা ভাবে, সেটাই এক ও একমাত্র জাতীয়তাবাদ! আজকাল ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দটা খুব চলছে। এমন ভাবে চলছে যাতে সেটা দিয়ে প্রথমেই বেশ একটা শিবির ভাগাভাগি করে ফেলা যায়: জাতীয়তাবাদী বনাম অ-জাতীয়তাবাদী, আমরা বনাম ওরা! অমিত শাহ ম্যাঙ্গালোরেও এ কথা বললেন, নরেন্দ্র মোদী দিল্লিতেও সেই ইঙ্গিত দিলেন।

শেষ আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ২১:৪৪
অন্য জাতীয়তা। চিত্তরঞ্জন দাশ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

অন্য জাতীয়তা। চিত্তরঞ্জন দাশ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আজকাল ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দটা খুব চলছে। এমন ভাবে চলছে যাতে সেটা দিয়ে প্রথমেই বেশ একটা শিবির ভাগাভাগি করে ফেলা যায়: জাতীয়তাবাদী বনাম অ-জাতীয়তাবাদী, আমরা বনাম ওরা! অমিত শাহ ম্যাঙ্গালোরেও এ কথা বললেন, নরেন্দ্র মোদী দিল্লিতেও সেই ইঙ্গিত দিলেন। জাতীয়তাবাদ তাঁদের প্রধান জোর, আর তাই, অ-জাতীয়তাবাদীদের খুঁজে খুঁজে চিহ্নিত করা তাঁদের অন্যতম বড় কাজ। অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ এখন তাঁদের ও তাঁদের শত্রুদের বিভাজিকা। তাঁদের রাজনীতির অস্ত্র। ‘বিরোধ’ তৈরির অস্ত্র।

দেখেশুনে মনে পড়ছিল, আমাদের পুরনো এক নেতা বলেছিলেন, ভারতে জাতীয়তাবাদ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটা জটিল ব্যাপার: ‘বিরোধের মীমাংসা’। কেননা ‘বিরোধ জাতির স্বাভাবিক ধর্ম। কিন্তু তাহা বলিয়া তো জাতিকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। প্রত্যেক পরিবার মধ্যে প্রত্যেক সমাজে বিরোধ বিসংবাদ তো লাগিয়াই আছে, তা বলিয়া কি সেই ব্যক্তিগুলোর অস্তিত্ব অস্বীকার করিতে হইবে, ছোট করিতে হইবে, না উড়াইয়া দিতে হইবে?’ আর এ দেশে যেহেতু অনেক পরিবার অনেক সমাজ, জাতিগঠনের প্রধান ধাপই হচ্ছে এই বিরোধ মেটানো।

না, অমিত শাহরা যখন বলেন, ‘জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধতা মানেই দেশের শত্রুতা’, তখন তাঁরা উপরের এই জাতীয়তাবাদের কথা তো বলেনই না, বরং তার একেবারে উল্টো শপথটাই নিয়ে ফেলেন। তাঁদের জাতীয়তাবাদের ভিত্তিগুলো অবধারিত ভাবে বিরোধ-মূলক। যেমন, গোমাংস-আহারীদের খুঁজে বার করা, গো-চর্ম পেশার উপর যাঁরা নির্ভর করেন, তাঁদের আলাদা করা, রাজনৈতিক স্বাধিকারের দাবি যাঁরা তোলেন, তাঁদের এক হাত দেখে নেওয়া। ‘জাতির স্বার্থে’, শুধুমাত্র ‘জাতির স্বার্থেই’, তাঁরা মুসলমানদের অস্তিত্ব ‘অস্বীকার’ করেন, দলিতদের ‘ছোট করে’ রাখেন, কাশ্মীরি বিদ্রোহীদের ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ পরিকল্পনা করেন। সহজ পথে না হলে লড়াই-এর পথ ভাবেন।

অর্থাৎ এই জাতীয়তাবাদের লক্ষ্য জাতি প্রতিষ্ঠার ‘লড়াই’। আর, যাঁর উদ্ধৃতি রইল ওপরে, সেই জাতীয়তাবাদীরা বলতেন, জাতি প্রতিষ্ঠার ‘কাজ’-এর কথা, বিরোধের সম্ভাবনা মিটিয়ে মিটিয়ে একটা বড় জাতি তৈরির কথা। মাত্র কয়েক মহাসাগর দূরত্ব এই দুই ভাবনার মধ্যে। প্রসঙ্গত, ওই পুরনো জাতীয়তাবাদী নেতার নাম দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

দেশবন্ধু একা নন। স্বাধীনতার আগে পরে এ দেশের বহু রাজনীতিবিদ ও চিন্তাবিদ এই একই বিষয় নিয়ে ভেবেছিলেন, বলেছিলেন, হাতে কলমে কাজ করেছিলেন। বহু বৈচিত্রময় এই দেশে জাতীয়তাবাদীরা প্রথম থেকেই এ বিষয়ে রীতিমত সচেতন ও সতর্ক ছিলেন। তাই ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদের মধ্যে যেমন একটা অসহিষ্ণু মতবাদও ছিল, তেমনই একটা উদার, মুক্তমনা দেশভাবনাও তৈরি হয়েছিল। ভারতমাতার স্লোগানের পাশাপাশি মহামানবের সাগরতীরবর্তী ভারতের শপথ শোনা গিয়েছিল। বন্দে মাতরম্-এর পাশে জনগণমন-অধিনায়কের জায়গা হয়েছিল। জাতীয়তাবাদ বিষয়টাকে ভেতর থেকে লাগাতার প্রশ্ন করে, বিচার করে, সংশোধন ও সম্মার্জন করে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, পুনর্নির্মাণ করে নানা ধারা জন্ম নিয়েছিল। আজ কি সে সব কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে তবে আমরা অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদীকেই জাতীয়তাবাদের এক ও একমাত্র প্রতিনিধি বলে মেনে নেব? বিশ্বাস করে নেব যে, জাতীয়তাবাদ বলতে মোদীরা আমাদের যা বোঝাচ্ছেন আজ, সেটাই ঠিক, আর সব ভুল?

জাতীয়তাবাদ জিনিসটা কিন্তু কোনও কালেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধাধরা একটিমাত্র ভাবনা নয়। জাতীয়তাবাদ একটা দেশভাবনার পরিসর, যেখানে বহু মত বহু পথের জায়গা সে দিনও হয়েছিল, আজও হতে পারে। ক্ষমতার নেশায় অমিত শাহরা যতই বলুন না কেন যে তাঁরাই জাতীয়তাবাদের একমাত্র ধ্বজাধারী, তাঁদের সেই এক ও অদ্বিতীয় ধ্বজাটিকে আমাদের ধরতেই হবে, তাঁদের বাগাড়ম্বর থামিয়ে দিয়ে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, জাতীয়তাবাদ কোনও একক নয়, বহু আর বিবিধ। ম্যাঙ্গালোর-হুঙ্কারের পাল্টা প্রতিহুঙ্কার দিতে হবে: ঠিক কোন জাতীয়তাবাদের কথা বলছেন আপনারা? নেহরুর? গাঁধীর? নেতাজির? দেশবন্ধুর? রবীন্দ্রনাথের? না কি শুধু সাভারকর-গোলওয়ালকরই আপনারা জানেন?

অমিত-নরেন্দ্র-সুভাষিতের প্রতিবাদ যে হচ্ছে না, তা নয়, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, প্রতিবাদটাও ভারি গোলমেলে। প্রধানমন্ত্রী যেই-না ঘোষণা করে এলেন, ন্যাশনালিজম তাঁর দলের প্রধান আইডেন্টিটি, অমনি কংগ্রেস বলে বসল, মোদী মিথ্যে বলছেন, ২০১৪ সালে তিনি তো জাতীয়তাবাদের কথা বলে জেতেননি, উন্নয়নের স্লোগানে জিতেছিলেন! যেন কী বলে তিনি নির্বাচন লড়েছিলেন সেটাই এখানে বিচার্য! যেন ন্যাশনালিজম-এর স্বত্ব দাবিটা গুরুতর কোনও কথাই নয়! কংগ্রেস মুখপাত্র পর্যন্ত জোর গলায় বলতে পারলেন না, জাতীয়তাবাদে কেবল বিজেপিই নেই, কংগ্রেসও আছে, ছিল, থাকবে। প্রতিবাদীরা বলে যাচ্ছেন, বিজেপি খারাপ সুতরাং জাতীয়তাবাদ খারাপ। বলছেন, গরু পুজোর ধূম, মুসলমান ঠেঙানোর নীতি, পাকিস্তানবিরোধিতার গুন্ডামি, এই সব নিপাত যাক, জাতীয়তাবাদ নিপাত যাক! অর্থাৎ তাঁরাও মেনে নিচ্ছেন, আরএসএস-বিশ্ব হিন্দু পরিষদ-ভারতীয় জনতা পার্টিরা যা বলে যা ভাবে, সেটাই এক ও একমাত্র জাতীয়তাবাদ! সমালোচনার সুরটা টেনে তাঁরা আরও লম্বা করছেন: এই তো, রবীন্দ্রনাথ বা গাঁধীও জাতীয়তাবাদকে কত খারাপ বলে এসেছেন, আজকের দিন হলে ওঁদেরও নির্ঘাত জেলে পোরা হত!

অর্থাৎ, প্রতিবাদীদের মুখে সবচেয়ে জরুরি কথাটা শোনা যাচ্ছে না যে, আমাদের দেশে কিছু অন্য জাতীয়তাবাদও ছিল! স্মরণ করা হচ্ছে না যে, গাঁধী, নেহরু, দেশবন্ধুরা তো বটেই, রবীন্দ্রনাথও কিন্তু জাতীয়তাবাদ পরিত্যাগ করে তার বাইরে গিয়ে দাঁড়াননি। জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং ভাবনার মধ্যে তিনি অসহিষ্ণুতা ও আগ্রাসন দেখেছিলেন, কিন্তু তাঁর কল্পনায় কোনও ‘জাতীয়’ ভাব বা ‘জাতীয়’ আদর্শ ছিল না, এমন কথা বলা যাবে না। জাতীয়তা, স্বাদেশিকতা, জাতীয় রাজনীতির বাঞ্ছিত প্রকৃতি নিয়ে তিনি প্রচুর আলোচনা করেছেন। সেটা স্বাভাবিকও বটে। বিদেশি শাসনের মধ্যে বসে যে স্বাধীনচেতা চিন্তাবিদ লেখালিখি করছেন, তাঁর ভাবনা থেকে কি আর জাতীয়তাবাদ পুরোপুরি বাদ যেতে পারে? তিনি কেবল অন্য রকম ভাবে সেই জাতি-কল্পনা করতে পারেন। ভারতের বিরাট বৈচিত্রের প্রতি যাতে অন্যায় না ঘটে, তার দিকে তাকিয়ে বলতে পারেন, সংকীর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির চেয়ে দেশগঠনের কাজে বেশি মন দাও, বলতে পারেন, ‘রাষ্ট্রিক মহাসন নির্মাণের চেয়ে রাষ্ট্রিক মহাজাতি-সৃষ্টির প্রয়োজন আমাদের দেশে অনেক বড়ো।’ তাঁর কাব্যিক ভাষার জট ছাড়িয়ে এই ‘অন্য’ জাতীয়তাবাদের ভাবটিকে যদি রাজনীতির ভাষায় অনুবাদ করে নিই আমরা, চিত্তরঞ্জন দাশের কথাগুলোও হয়তো আবার নতুন করে বুঝতে পারব: জাতীয়তাবাদের প্রধান কাজ ‘বিরোধের মীমাংসা’।

রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদী ভাবনাকে যে তুচ্ছ করা চলে না, তার বড় কারণ জওহরলাল নেহরু। গাঁধীর থেকে রবীন্দ্রনাথের ভাবনাচিন্তারই বেশি কাছাকাছি বাস করতেন তিনি। তাঁর জাতীয়তাবাদী চিন্তায় রবীন্দ্রনাথের আদর্শের প্রতিধ্বনি, রবীন্দ্রনাথের সতর্কবাণীর ছায়া। আধুনিকতা আর আন্তর্জাতিকতা সেই জাতীয়তার দু-দুটো প্রধান খুঁটি, সমাজ-সম্প্রদায়-জাতপাতের বিরোধ-মীমাংসা সেই জাতীয়তা প্রতিষ্ঠার প্রধান পথ, উন্নয়ন ও প্রগতি তাঁদের দুই জনের জাতীয়তারই প্রধান গন্তব্য। রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজম-সমালোচনার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আইজায়া বার্লিন বলেছিলেন যে, ‘টেগোরের মধ্যপন্থা’র চমৎকার ব্যবহার তাঁকে মুগ্ধ করে: কেননা রবীন্দ্রনাথ আধুনিক সভ্যতার বাড়াবাড়িকেও পরিহার করেন, আবার সনাতন সভ্যতার সংকীর্ণতার মধ্যেও তলিয়ে যান না। একই কথা বলা যায় নেহরু বিষয়ে। নেহরুর ‘ইন্ডিয়া’-ভাবনার বিশ্লেষণের শেষে ইতিহাসবিদ সুনীল খিলনানি লিখেছেন: ‘নেহরু হ্যাড দ্যাট ক্যাপাসিটি টু কিপ দ্য সেন্টার।’

মাননীয় বিজেপি সভাপতি, এ সবও কিন্তু জাতীয়তাবাদ। আমাদেরই নিজস্ব জাতীয়তাবাদ। পুরনো সংস্কৃতি ও নতুন বিশ্বের মধ্যে সেতু তৈরি করেছিল এই অন্য এবং অন্যান্য জাতীয়তাবাদ, জাত-ধর্ম-বর্ণ নিরপেক্ষ ভাবে সামাজিক সমন্বয়ের আদর্শ রাজনীতির তত্ত্বে-প্রয়োগে নিয়ে এসেছিল। এদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা-তর্ক-বিতর্ক সবই চলত। কিন্তু নিজের মত না মানলেই কেউ কাউকে ‘শত্রু’ বলে দাগিয়ে দিত না। বিরোধের হুঙ্কার দিত না। আজ আপনাদের দলবল আমাদের ভুলিয়ে দিতে চাইছে যে এই অন্য জাতীয়তাবাদগুলি ছিল, আজও আছে। প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, জাতীয়তাবাদ একটিই, তার উত্তরাধিকার নাকি আপনাদেরই হাতে।

আমরাও স্বভাবত বিস্মরণপ্রবণ। মোদীবাদকে আটকাতে গিয়ে তাই আমরা জাতীয়তাবাদেরই বাপান্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছি। জাতীয়তাবাদের বহু স্বর বহু ঐতিহ্য বিস্মৃত হয়েছি। গামলার নোংরা জল ফেলতে গিয়ে স্নানরত বাচ্চাটিকেও ফেলে দিচ্ছি। ভুলে যাচ্ছি যে, যত এই বিস্মরণ, মোদী রাজনীতির ততই লাভ। দেশ জুড়ে জাতীয়তাবাদের যে প্রবল পরিব্যাপ্ত আবেগ, যুক্তি, ইতিহাস, সবই আজ তাই নব-হিন্দুত্ববাদের ছাতার তলায় জড়ো হচ্ছে, আমাদের বিস্মরণময় নৈঃশব্দ্যের অবকাশে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy